প্রকাশিত: ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৯ পিএম
হামিদুল ইসলাম মিন্টু।
কিছু ভ্রমণ শুধু চোখকে আনন্দ দেয়, কিছু ভ্রমণ মনকে ছুঁয়ে যায়, আর কিছু ভ্রমণ আমাদের চিন্তার জগৎটাকেই বদলে দেয়। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে আমার দশ দিনের সফর ছিল ঠিক তেমনই এক অভিজ্ঞতা যেখানে ভ্রমণের আনন্দের সঙ্গে মিশে ছিল শিক্ষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, মানুষ এবং নতুনভাবে পৃথিবীকে দেখার এক অসাধারণ সুযোগ।
এই সফরটি ছিল নিছক কোনো পর্যটন নয়; বরং Oxford International-এর আমন্ত্রণে এবং Diakonia Bangladesh-এর সহযোগিতায় আয়োজিত একটি Education Exchange Programme-এর অংশ হিসেবে লন্ডন যাত্রা। তাই বিমানবন্দরে পা রাখার মুহূর্ত থেকেই মনে হচ্ছিল এবারের ভ্রমণ শুধু নতুন কোনো দেশ দেখার নয়, বরং নতুন কিছু শেখারও।
লন্ডনে প্রথম সকাল: অন্যরকম এক অনুভূতি
লন্ডনে পৌঁছানোর পর প্রথম যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল, তা হলো শহরটির বৈচিত্র্য। একই শহরের বুকেই যেন পাশাপাশি বসবাস করছে শত শত বছরের ইতিহাস আর আধুনিক বিশ্বের ব্যস্ততম জীবনধারা।
রাস্তার দুপাশের পুরোনো স্থাপত্য, লাল ডাবল ডেকার বাস, ব্যস্ত Underground, নানা দেশের মানুষের আনাগোনা সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনো সিনেমার দৃশ্যের ভেতর দিয়ে হাঁটছি।
কিন্তু এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল শেখা।
Education Exchange Programme-এর বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নিতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, শিক্ষা শুধু শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অন্য দেশের শিক্ষা-ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষকদের চিন্তাধারা এবং শিক্ষার্থীদের শেখার পদ্ধতি সম্পর্কে জানাও শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
Goldsmiths University: আতিথেয়তায় মুগ্ধতা
সফরের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় ছিল Goldsmiths, University of London-এ সময় কাটানো।বিশ্ববিদ্যালয়টির আতিথেয়তা ছিল সত্যিই প্রশংসনীয়। শিক্ষার পরিবেশ, আলোচনার ধরন, একাডেমিক চিন্তাভাবনা এবং মানুষের আন্তরিকতা আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল।
একজন শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত মানুষ হিসেবে সেখানে দাঁড়িয়ে আমার মনে বারবার একটি কথাই মনে হচ্ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়; একটি বিশ্ববিদ্যালয় হলো চিন্তার স্বাধীনতা, প্রশ্ন করার সাহস এবং নতুন কিছু আবিষ্কারের জায়গা। Goldsmiths-এর পরিবেশ আমাকে সেই কথাটিই নতুন করে উপলব্ধি করিয়েছে।
অক্সফোর্ড: ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে
লন্ডন সফরের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি ছিল ঐতিহ্যবাহী University of Oxford দেখা।অক্সফোর্ডের নাম আমরা বইয়ে পড়েছি, ছবিতে দেখেছি, অসংখ্য জ্ঞানী মানুষের জীবনের সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম জড়িত শুনেছি। কিন্তু সেই জায়গায় নিজের চোখে দাঁড়িয়ে যাওয়ার অনুভূতিটা একেবারেই আলাদা।
পুরোনো ভবনগুলোর দেয়ালে যেন শত শত বছরের জ্ঞানচর্চার গল্প লেখা। পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, কত অসংখ্য মেধাবী মানুষ এই পথ দিয়ে হেঁটেছেন, কত প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন, কত নতুন চিন্তার জন্ম হয়েছে এই প্রাঙ্গণে!
সেদিন উপলব্ধি করলাম
একটি ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু ভালো ফলাফল তৈরি করে না; এটি মানুষের চিন্তার পরিধি বড় করে।অক্সফোর্ড আমার কাছে তাই শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটি জ্ঞান ও ঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতীক।
জাদুঘরে ইতিহাসের সঙ্গে দেখা
লন্ডনের বিখ্যাত জাদুঘরগুলোও ছিল এই সফরের অন্যতম আকর্ষণ। জাদুঘরে ঢুকলেই মনে হয়েছে, আমরা আসলে শুধু প্রদর্শনী দেখছি না আমরা সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটছি।প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন, শিল্পকর্ম, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির নানা চিহ্ন সবকিছু একসঙ্গে দেখে মনে হয়েছে, পৃথিবীর ইতিহাস কত বিশাল!
একটি বইয়ে ইতিহাস পড়লে আমরা তথ্য জানতে পারি, কিন্তু একটি ঐতিহাসিক বস্তু নিজের চোখে দেখলে সেই ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে।এই অভিজ্ঞতা আমাকে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে,শিক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমগুলোর একটি হলো বাস্তব অভিজ্ঞতা।
পার্কের সবুজে লন্ডনের অন্যরূপ
লন্ডনকে আমরা সাধারণত ব্যস্ত শহর হিসেবে কল্পনা করি। কিন্তু শহরটির ঐতিহাসিক ও মনোরম পার্কগুলো আমাকে লন্ডনের একেবারেই অন্য একটি রূপ দেখিয়েছে।
শীতের আবহাওয়া, গাছের সারি, খোলা আকাশ আর নিরিবিলি হাঁটার পথ কখনো মনে হয়েছে শহরের কোলাহল থেকে কয়েক মুহূর্তের জন্য অন্য এক পৃথিবীতে চলে এসেছি।
এই পার্কগুলো শুধু সৌন্দর্যের জায়গা নয়; মানুষের অবসর, সামাজিকতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্কেরও এক অসাধারণ উদাহরণ।
টেমসের তীরে দাঁড়িয়ে
আর তারপর এলো সেই মুহূর্ত River Thames-এর তীরে দাঁড়ানো।টেমস নদীকে কতবার ছবি ও ভিডিওতে দেখেছি! কিন্তু বাস্তবে তার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, নদী শুধু পানি বয়ে নেয় না সে একটি শহরের ইতিহাসও বহন করে।
টেমসের তীরে দাঁড়িয়ে লন্ডনের আকাশ, নদীর স্রোত আর চারপাশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, এই নদী কত শত বছরের গল্পের সাক্ষী!
কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ চলে গেছে, কত রাজা-রানির সময় পেরিয়ে গেছে, কত যুদ্ধ, বিপ্লব, পরিবর্তন সবকিছুর নীরব সাক্ষী হয়ে টেমস আজও বয়ে চলেছে।
London Bridge ও Big Ben: ছবির শহর বাস্তবে
লন্ডন ব্রিজের কাছে দাঁড়িয়ে মনে হলো, এতদিন যে লন্ডনকে বইয়ের পাতায় চিনেছি, আজ সেই লন্ডন আমার সামনে।আর Big Ben তথা Elizabeth Tower—এটি যেন লন্ডনের পরিচয়েরই একটি অংশ।
ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, সময় আসলে কী অদ্ভুত! মানুষ বদলায়, শহর বদলায়, প্রজন্ম বদলায়; কিন্তু ইতিহাসের কিছু প্রতীক সময়কে অতিক্রম করে মানুষের স্মৃতিতে থেকে যায়।
লন্ডনের বিখ্যাত স্থাপনাগুলো তাই আমার কাছে শুধু ছবি তোলার জায়গা ছিল না; প্রতিটি জায়গাই ছিল ইতিহাস শেখার একটি নতুন অধ্যায়।
শিক্ষাসফরের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
এই দশ দিনের সফরে আমি সবচেয়ে বড় যে শিক্ষা পেয়েছি, তা হলো পৃথিবীকে জানতে হলে পৃথিবীর মানুষের কাছাকাছি যেতে হয়।একটি দেশের শিক্ষা-ব্যবস্থা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, স্থাপত্য, জাদুঘর, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা সাধারণ মানুষের জীবন সবকিছুই আমাদের শেখায়।
Education Exchange Programme আমাকে বুঝিয়েছে, শিক্ষা কোনো সীমান্ত মানে না। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাজ্য দুই ভিন্ন সংস্কৃতি, দুই ভিন্ন বাস্তবতা; কিন্তু জ্ঞান, শিক্ষা এবং ভালো কিছু করার স্বপ্ন আমাদের সবাইকে একই জায়গায় এনে দাঁড় করায়।
এই সফরে আমি যেমন লন্ডনকে দেখেছি, তেমনি নিজের দেশ ও নিজের শিক্ষাব্যবস্থাকেও নতুন চোখে দেখার সুযোগ পেয়েছি।
কিছু মানুষ, কিছু ঋণ
একটি ভ্রমণকে স্মরণীয় করে তোলে শুধু জায়গা নয়, মানুষও।আমার এই সফরের স্মৃতিতে আইরিন আপু ও দুলাভাই এবং ফয়সাল ভাই ও ভাবীর আন্তরিক আতিথেয়তা বিশেষভাবে জড়িয়ে আছে। বিদেশের মাটিতে আপনজনের মতো তাদের আন্তরিকতা, যত্ন ও ভালোবাসা এই সফরকে আরও আনন্দময় করে তুলেছিল।
ভ্রমণের শেষে অনেক জায়গার নাম হয়তো মনে থাকবে, অনেক ছবিও হয়তো সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের আন্তরিকতা সেটি কখনো পুরোনো হয় না।
তাদের আতিথেয়তা ও ভালোবাসা আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রাখব।
দশ দিন শেষে
দশ দিন খুব দ্রুত কেটে গেল।ফেরার সময় মনে হচ্ছিল, মাত্র কয়েকদিন আগেই তো এই শহরে এসেছিলাম! অথচ এরই মধ্যে কত স্মৃতি জমে গেছে—বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডোর, জাদুঘরের নিদর্শন, অক্সফোর্ডের ঐতিহাসিক পথ, পার্কের সবুজ, টেমসের ঢেউ, লন্ডন ব্রিজ, Big Ben-এর ঘড়ি, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় এবং অসংখ্য শেখার মুহূর্ত।
বিমান যখন লন্ডনের মাটি ছেড়ে আকাশে উঠল, জানালার বাইরে তাকিয়ে মনে হলো একটি শহরকে পেছনে ফেলে যাচ্ছি, কিন্তু শহরটি আমার ভেতরে অনেক কিছু রেখে গেছে।
ফিরে আসছি বাংলাদেশে, কিন্তু সঙ্গে নিয়ে আসছি নতুন কিছু প্রশ্ন, নতুন কিছু চিন্তা, নতুন কিছু স্বপ্ন।
হয়তো এটাই একটি সত্যিকারের শিক্ষাসফরের সার্থকতা।
লন্ডন আমাকে শুধু কিছু বিখ্যাত জায়গা দেখায়নি; আমাকে শিখিয়েছে ইতিহাসকে অনুভব করতে, শিক্ষাকে নতুনভাবে দেখতে, মানুষের আতিথেয়তার মূল্য বুঝতে এবং পৃথিবীকে আরও বড় করে ভাবতে।
আজও চোখ বন্ধ করলে দেখি টেমসের জলে লন্ডনের আলো ঝিলমিল করছে, দূরে Big Ben দাঁড়িয়ে আছে, আর ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে কোনো এক নীরব বিকেলে আমি দাঁড়িয়ে আছি অক্সফোর্ডের প্রাচীন প্রাঙ্গণে।
দশ দিনের সেই সফর শেষ হয়েছে অনেক আগেই।
কিন্তু সত্যিকারের কিছু ভ্রমণ কখনো শেষ হয় না।তারা থেকে যায় স্মৃতিতে, চিন্তায়—আর কখনো কখনো আমাদের জীবনদর্শনের অংশ হয়ে।
লন্ডন, তুমি তাই আমার কাছে শুধু একটি শহর নও
তুমি একসঙ্গে ইতিহাস, শিক্ষা, অনুভূতি এবং অমলিন কিছু স্মৃতির নাম।
লেখক : মিরপুরের চারুপাঠের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রিন্সিপাল
