প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম
শিক্ষক—শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করা একজন মানুষ নন; একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্ন দেখা, নিজেকে গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যতের পথ বেছে নেওয়ার পেছনেও থাকে কোনো না কোনো শিক্ষকের অবদান। প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সেই মানুষগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়। শিক্ষক দিবসকে ঘিরে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শিক্ষার্থীদের মাঝেও উঠে এসেছে শিক্ষকদের নিয়ে নানা অনুভূতি, স্মৃতি, প্রত্যাশা ও আক্ষেপ। কারও কাছে শিক্ষক অনুপ্রেরণার উৎস, কারও কাছে পথপ্রদর্শক, আবার কারও কাছে প্রথম শিক্ষক হিসেবে মায়ের অবদানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নোবিপ্রবি বাংলা বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাঈমা আক্তারের কাছে সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক তাঁর কলেজের দুই শিক্ষক জাহিদ স্যার ও হাবিব স্যার। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পেছনেও তাঁদের অনুপ্রেরণার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “ইতিহাসকে প্রশ্ন করতে হবে”—জাহিদ স্যারের বলা এই কথাটি জীবনের প্রতিটি ঘটনা বিশ্বাস করার আগে তিনি মনে রাখেন। আর হাবিব স্যারের কাছ থেকে পেয়েছেন পরিশ্রমী ও অধ্যবসায়ী হওয়ার অনুপ্রেরণা।
নাঈমার মতে, “আদর্শ শিক্ষক তিনি, যিনি কেবল পড়ান না; বরং একজন শিক্ষার্থীকে সফলতার পথ দেখান এবং মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সহায়তা করেন।” নোবিপ্রবির শিক্ষকদের প্রতি তাঁর প্রত্যাশা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁরা যেন আরও সহজভাবে মেশেন, শিডিউল মেনে ক্লাস নেন এবং যথাসময়ে সিলেবাস শেষ করেন।
বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক নিয়েও আক্ষেপ রয়েছে নাঈমার। তাঁর ভাষায়, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী কেউই যেন একে অপরের প্রতি যথেষ্ট আন্তরিক নন। “কেমন যেন রোবোটিক এক সম্পর্ক। দুই পক্ষই স্বার্থ নিয়ে থাকে। এ দিকটির উন্নতির প্রয়োজন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর হোক আত্মার সম্পর্ক, যা রক্তের সম্পর্কেও হার মানাবে”—বলেন তিনি।
একই ধরনের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মাজেদা বেগম। তাঁর মতে, একজন আদর্শ শিক্ষক এমন হবেন, যিনি খেয়াল রাখবেন তাঁর শিক্ষার্থী তাঁর কাছ থেকে কতটুকু শিখতে পারছে। শুধু দায়িত্ব পালনের জন্য পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীদের শেখানো এবং আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষকের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
মাজেদা বলেন, শিক্ষকতাকে শুধু পেশা হিসেবে না দেখে হাজারো আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে দেখা উচিত। বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ, সম্পর্কটি ‘শিক্ষা গুরুর মর্যাদা’ কবিতার গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। এর পেছনে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষার ঘাটতি এবং অভিভাবকদের অতিরিক্ত আদরের পাশাপাশি শিক্ষকদেরও কিছু দায়বদ্ধতা রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে শিক্ষকের সংজ্ঞাকে আরও বিস্তৃত জায়গা থেকে দেখেন ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান। তাঁর কাছে জীবনের প্রথম শিক্ষক তাঁর মা। তিনি বলেন, “জীবনের প্রতিটি ধাপে যার শিক্ষা আমার পাথেয়, যে শিক্ষা ক্লাসের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ নয়—বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখার চেয়েও বড় যে শিক্ষা, তা আমাকে দিয়েছে আমার আম্মু।”
বিপদে ধৈর্য ধারণ, সাফল্যে বিনয়ী থাকা এবং ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার শিক্ষা তিনি মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছেন বলে জানান। মায়ের প্রতিটি উপদেশ, স্নেহময়ী শাসন ও উৎসাহ তাঁর ব্যক্তিত্বের অংশ হয়ে উঠেছে। শিক্ষক দিবসে নিজের সেই ‘প্রথম শিক্ষক’-এর প্রতি অসীম শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান ইসরাত।
অন্যদিকে, শিক্ষক দিবসকে শুধু শিক্ষকদের সম্মান জানানোর দিন হিসেবে দেখেন না ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নজরুল ইসলাম মনজু। তাঁর কাছে এটি শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা ও অনুপ্রেরণাকে স্মরণ করারও একটি বিশেষ দিন। তাঁর মতে, প্রিয় শিক্ষকদের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি ভালো মানুষ হওয়া এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও লক্ষ্যের প্রতি অটুট থাকা।
নজরুলের মতে, একজন আদর্শ শিক্ষকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গুণ হলো শিক্ষার্থীদের বুঝতে পারার মানসিকতা। শিক্ষার্থীর দুর্বলতা, স্বপ্ন ও সম্ভাবনা বুঝতে পারলে একজন শিক্ষক শুধু শিক্ষক থাকেন না, হয়ে ওঠেন একজন পথপ্রদর্শক।
নোবিপ্রবির শিক্ষকদের কাছে তাঁর প্রত্যাশা, একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেন সঠিক দিকনির্দেশনা, উৎসাহ ও মানসিক সমর্থন পান। তাঁর ভাষায়, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ককে আরও সুন্দর ও কার্যকর করতে উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মান ও যোগাযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
নজরুল আরও বলেন, একজন শিক্ষকের একটি সঠিক পরামর্শ, উৎসাহের একটি কথা কিংবা শিক্ষার্থীর প্রতি তাঁর বিশ্বাস জীবন ও ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তাই শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না; একজন শিক্ষার্থীর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথও দেখান।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে শিক্ষক দিবসে যেমন উঠে এসেছে শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা, তেমনি উঠে এসেছে শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক আরও মানবিক ও আন্তরিক করার প্রত্যাশাও। তাদের প্রত্যাশা, একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও সংকটের জায়গাগুলোতেও পাশে থাকবেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ ও আন্তরিকতা বজায় রাখবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার এই সম্পর্কই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলতে পারে।
