প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:১২ এএম
ডাঃ ফাহমিদা সুলতানা জোনাকী
বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় নারীর অংশগ্রহণ বিচ্ছিন্ন কোন বিষয় নয় । ঘর ও পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষা, কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা ও উদ্যোক্তা কার্যক্রম থেকে শুরু করে সমাজের নানা পেশায় নারীরা নিজেদের অবস্থান তৈরি করে যাচ্ছে।নিজেদের মেধা, দক্ষতা ও সার্মথ্যকে কাজে লাগিয়ে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নারী ও পুরুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণের ফলে সমাজ ও রাষ্ট্রের অগ্রগতির পথ দিনেদিনে সুদৃঢ় হচ্ছে, যা বাংলাদেশের টেকসই আর্থ-সামাজিক উন্নয়নকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য একটি সম্ভাবনাময় ভিত্তি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) “Labour Force Survey 2024” অনুযায়ী -দেশে নারীদের শ্রম শক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮.৪ শতাংশ। এই বিপুল সংখ্যক নারীর অংশগ্রহণ শধু দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে না, বরং নারীর ক্ষমতায়ন, আত্মনির্ভরশীলতা এবং সামাজিক অবস্থানেও ইতিবাচক পরিরর্তন নিয়ে আসছে। কর্মক্ষেত্রে নারীর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি বজায় রাখতে-নিরাপদ কর্মপরিবেশ,নিরাপদ ও সহজলভ্য যাতায়াত ব্যবস্থা এবং সকল ধরনের হয়রানি ও বৈষম্য থেকে নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এই নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার তাদের কর্মপরিকল্পনার অংশ হিসেবে নারীদের সহজ ও নির্বিঘ্ন যাতায়াতে সংযুক্ত করেছে ”নারীবান্ধব গোলাপী (পিংক) বাস সার্ভিস”, যেটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের একটি অংশ।
২০২৪ সালে প্রকাশিত BRAC James P Grant School of Public Health এর ঢাকা ভিত্তিক গবেষণা অনুসারে-ঢাকার গণপরিবহনে যাতায়াতকারী প্রায় ৭৯ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ এই অভিজ্ঞতায় মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত বা ট্রমাগ্রস্ত হয়েছে এবং ১২ শতাংশ নারী এই অভিজ্ঞতা কাটিয়ে উঠতে পারে নি।অপরদিকে আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল International Journal of Research and Innovation in Social Science (IJRISS)-এ প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, গণপরিবহনে নারীদের প্রতি হয়রানির হার অত্যন্ত বেশি-দুর্ভাগ্যজনকভাবে যা ৬৮ শতাংশ। গবেষণার চিত্রে আরও দেখা যায়, ৮০ শতাংশ গণপরিবহন অতিরিক্ত ভিড়পূর্ণ থাকায় নারীরা বাসে ওঠা ও নামার সময় নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়। বাস্তবে, ৭০ শতাংশ নারী হেলপার/কন্ডাক্টর বা চালকের দুর্ব্যবহারের শিকার হয় এবং ২০ শতাংশ নারী সহযাত্রীদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়। এছাড়াও গণপরিবহনে নারীদের জন্য বুলিং (২০ শতাংশ) এবং শারীরিক গঠন নিয়ে কটূক্তি বা বডি শেমিং (১৬ শতাংশ) ছিল উল্লেখযোগ্য সমস্যা।
গণপরিবহনে নারীদের এমন চিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে পিংক বাস সার্ভিসের মত নারীবান্ধব পরিহণ ব্যবস্থা নারীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ঢাকার মত জনবহুল ও ব্যস্ত নগরীতে অফিসে যাতায়াতকালীন সময়ে সাধারণত গণপরিবহনগুলোতে উপচে পড়া ভিড় থা্কে। এমন পরিস্থিতিতে নারীদের বাসের সিটে বসে যাওয়া ত দূরের কথা, দাঁড়িয়ে যাওয়া এমনকি বাসে ওঠাও চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়ে। এমতাবস্থায় পিংক বাস সার্ভিসগুলোতে কর্মজীবী নারী অথবা স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে বাসের সিটে বসে অথবা সল্প দূরত্বে দাঁড়িয়েও যেতে পারবে।
বর্তমান সরকারের সদিচ্ছায় ঢাকার বিভিন্ন রুটে এবং আংশিকভাবে বগুড়া ও চট্রগ্রামে বিআরটিসি কতৃক এই বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। আপাতত ১৪ টি বাস নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও আগামী ৩ মাসের মধ্যে ৫০ টি এবং পর্যায়ক্রমে ১০০ টি ইলেকট্রিক বাস চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পিংক বাস সার্ভিসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর চালক, সহকারী এবং কন্ডাকটর হিসেবে নারীরাই দায়িত্ব পালন করবে। এমন সিদ্ধান্ত যেমন নারী যাত্রীদের আস্থা এবং স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবেশ তৈরি করবে একই সাথে সমাজে নারীর ক্ষমতায়নের একটি শক্তিশালী বার্তা বহন করে-যে সঠিক সুযোগ ও প্রশিক্ষণ পেলে নারীরাও যেকোনো দায়িত্বশীল ও চ্যালেঞ্জিং পেশায় সমান দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করে সমাজে লিঙ্গভিত্তিক ধারণাকে বদলে দিতে পারে।
তবে দুঃখজনক হলেও সত্য-সমাজের একটি অংশ এই উদ্যোগের ইতিবাচক দিকগুলোকে উপেক্ষা করে বিদ্রুপ ও ট্রল করতেই ব্যস্ত। অথচ বাস্তবতা হলো, আমাদের নগর পরিবহনব্যবস্থা এখনও নানা সীমাবদ্ধতা ও অব্যবস্থাপনার মধ্যে দিয়ে চলছে। অনেক সড়কে নেই আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নেই পর্যাপ্ত প্রশস্ত সড়ক কিংবা পরিকল্পিত গণপরিবহন অবকাঠামো। দেশের বড় বড় শহরগুলোতে রাস্তার পাশে গড়ে ওঠা স্বল্প পুঁজিনির্ভর ব্যবসা, অনিয়ন্ত্রিত পার্কিং ও অবৈধ দখলের কারণে গণপরিবহন চলাচলও প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এতসব প্রতিকূলতা ও চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশের নারীরা গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—এটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও আশাব্যঞ্জক। বিশেষ করে এমন একটি সময়ে, যখন বিশ্বের অনেক দেশেই সড়ক পরিবহন খাতে নারীর অংশগ্রহণ এখনও সীমিত, তখন নারীদের এই অগ্রযাত্রাকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।আন্তর্জাতিক সড়ক পরিবহন ইউনিয়ন (IRU)-এর তথ্যানুসারে, ডেনমার্কে বাস ও কোচচালকদের প্রায় ২২ শতাংশ নারী। ইউরোপে এই হার গড়ে ১২ শতাংশের কিছুটা কম। বিশ্বব্যাপী সড়ক পরিবহন খাতের মোট কর্মীর মধ্যে নারীর অংশ মাত্র ১০ শতাংশ। তবে ইউরেশিয়া ও ইউরোপে এ হার তুলনামূলকভাবে বেশি-উভয় অঞ্চলেই প্রায় ২২ শতাংশ। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে সড়ক পরিবহন খাতে নারীদের অংশগ্রহণ প্রায় ২৮ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, সড়ক পরিবহন খাতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো বিশ্বব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সেই বাস্তবতায় বাংলাদেশের নারীরা নানা সামাজিক, অবকাঠামোগত ও পেশাগত প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে গণপরিবহন ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে—এটি অবশ্যই ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।
তাই নারীদের গণপরিবহনে যুক্ত হওয়ার বিষয়টিকে বিদ্রুপ বা নেতিবাচক দৃষ্টিতে না দেখে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করা উচিত। একটি উদ্যোগে সমস্যা বা সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে; সেগুলো নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা প্রয়োজন। কিন্তু উপহাস বা ট্রল কোনো সমস্যার সমাধান করে না, বরং নারীদের কর্মক্ষেত্রে এগিয়ে যাওয়ার পথে সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকেই আরও শক্তিশালী করে। নারীবান্ধব এই বাস সার্ভিসের সফলতা ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়, বরং সকলের সহযোগিতা, ব্যক্তিগত সচেতনতা ও ইতিবাচক মানসিকতাও জরুরি। এই সেবার প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ, নিয়ম মেনে চলা এবং নারীদের নিরাপদ যাতায়াতে সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা এই উদ্যোগকে টেকসই করে তুলতে পারি।
