মঙ্গলবার ১৮, আগস্ট ২০২৬

মঙ্গলবার ১৮, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

হামাগুড়ি দিয়ে কলেজে যাওয়া মনা এবার পাস করেছেন এইচএসসি

মৌলভীবাজার থেকে রাজন হোসেন তৌফিক

প্রকাশিত: ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম

সংগৃহীত ছবি

দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটার সামর্থ্য নেই। বাঁ হাতেও নেই প্রয়োজনীয় শক্তি। দাঁড়াতে পারেন না, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাও সম্ভব নয়। তাই ডান হাত ও ডান পায়ের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়েই প্রতিদিন প্রায় এক কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে গাড়িতে উঠতেন মনা বেগম (২০)। এরপর সেই গাড়িতে চড়ে যেতেন কলেজে।

রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে এভাবেই চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও দারিদ্র্য কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তার শিক্ষার আগ্রহকে। অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এখন তার লক্ষ্য ডিগ্রি (পাস) পড়া শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া। তবে অর্থসংকট ও চলাচলের সীমাবদ্ধতা তার সেই স্বপ্নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মনা বেগম মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের রত্না চা-বাগানের ফাঁড়ি এলাপুর বাগানের দিনমজুর হারিছ মিয়া ও আমিনা বেগমের মেয়ে। পাশের ফুলতলা ইউনিয়নের শাহ নিমাত্রা সাগরনাল-ফুলতলা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে তিনি জিপিএ ২.৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন।

জন্মের পর থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে উঠছেন মনা। বাঁ হাত, বাঁ পা ও কোমরে শক্তি না থাকায় নিজের পায়ে দাঁড়ানো সম্ভব নয় তার। দৈনন্দিন চলাফেরায় তাই হামাগুড়িই তার একমাত্র ভরসা।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথটিও ছিল কষ্টে ভরা। বাড়ি থেকে কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হতো গাড়িতে ওঠার জন্য। কলেজ শেষে বাড়ি ফেরার সময়ও একইভাবে পথটি পাড়ি দিতে হতো। দীর্ঘ এই যাত্রায় অনেক সময় শরীর এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ত যে শ্বাস নিতে কষ্ট হতো।

মনা বেগম বলেন, জন্ম থেকেই আমি প্রতিবন্ধী। পায়ে হাঁটতে পারি না। হাতের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করি। এভাবেই কষ্ট করে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছি। এখন ডিগ্রিতে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু বই কেনার মতো সামর্থ্য আমাদের নেই।

যাতায়াতের কষ্টের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠতে হয়। ফেরার সময়ও একইভাবে আসতে হয়। এতে শরীর খুব দুর্বল হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় শ্বাস নিতে পারছি না।

বর্তমানে ডিগ্রি (পাস) শ্রেণিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন মনা। কিন্তু ভর্তি, বই কেনা ও যাতায়াতের খরচ জোগানোর সামর্থ্য নেই তার পরিবারের। বাবা ও ছোট ভাই দিনমজুরি করে সংসার চালান। জরাজীর্ণ একটি ঘরে মা-বাবা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে বসবাস তাদের।

নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে মনা বলেন, আমি পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করতে চাই। কিন্তু প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে কোনো চাকরি পাচ্ছি না। আমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলে আমি নিজের খরচ নিজে চালানোর চেষ্টা করবো।

সহজে চলাচলের জন্য একটি অটোরিকশা এবং পরিবারের জন্য একটি ভালো ঘর চান মনা। তার মতে, একটি অটোরিকশা থাকলে কলেজে যাতায়াতের কষ্ট অনেকটাই কমে যেত এবং নিজের দৈনন্দিন কাজও সহজে করতে পারতেন।

মনার মা আমিনা বেগম বলেন, আমার প্রতিবন্ধী মেয়েটারে ছোট থেকে অনেক কষ্ট করে বড় করেছি, লেখাপড়া করিয়েছি। এখন অর্থের অভাবে আর পড়াতে পারছি না। মেয়েটার যদি একটা অটোরিকশা থাকত, তাহলে সে নিজে চলাফেরা করতে পারতো।

স্থানীয় বাসিন্দারাও মনার অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রশংসা করেছেন। তাদের ভাষ্য, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাতের ওপর ভর দিয়ে নিয়মিত কলেজে যাতায়াত করা তার জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। চলাচলের জন্য একটি অটোরিকশা পেলে পড়াশোনার পাশাপাশি তার দৈনন্দিন জীবনও অনেক সহজ হবে।

জুড়ীর সামসুদ্দিন আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন চাষা মনার শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, মনা আমার বিদ্যালয়ে পড়ার সময় খুব ভালো ছাত্রী ছিলো। লেখাপড়ার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিলো। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সে অনেক কষ্ট করে হামাগুড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করতো।

শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও মনার শিক্ষাজীবনের এই লড়াই স্থানীয়দের কাছে অনুপ্রেরণার উদাহরণ হয়ে উঠেছে। এখন পড়াশোনা চালিয়ে যেতে প্রয়োজন আর্থিক সহায়তা, শিক্ষা উপকরণ এবং নিরাপদ ও সহজ চলাচলের ব্যবস্থা। এসব সহযোগিতা পেলে সরকারি চাকরির স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যেতে চান মনা।


 

Link copied!