প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণে প্রতিবছর অসংখ্য শিক্ষার্থী পাড়ি জমান নিজ বাড়ি ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে দূরের শহরে। স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আনন্দের পাশাপাশি শুরু হয় নতুন জীবন। নতুন শহর, মানুষ, পরিবেশ ও খাবারের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার এই যাত্রায় সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় পরিবার, বিশেষ করে মায়ের স্নেহ ও যত্নের অভাব।
উচ্চশিক্ষার জন্য বাড়ি ছেড়ে আসা কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার অভিজ্ঞতা সবার আলাদা হলেও পরিবারের স্মৃতি তাদের প্রায় সবার সঙ্গী। তাদের সাথে আলাপচারিতাকে আপনাদের জন্য তুলে ধরেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সজিব উদ্দিন।
‘মায়া ত্যাগ, একটু কষ্ট, পড়াশোনা-সবই করতে হবে’
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসমিন আক্তারের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়ার আনন্দে প্রথমবার বাড়ি ছাড়ার সময় পরিবারের জন্য তেমন কষ্ট অনুভব করেননি তিনি। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য ছিলেন উচ্ছ্বসিত।
তবে বাড়িতে প্রথমবার দুই দিনের জন্য গিয়ে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার সময় অনুভূতিটা বদলে যায়। পরিবার ও মায়ের মায়া ছেড়ে আসার কষ্ট তখন গভীরভাবে অনুভব করেন তিনি।
ইয়াসমিন বলেন, প্রায়ই তার মা ও ছোট বোনের কথা মনে পড়ে। তবে নিজের ও পরিবারের স্বপ্ন পূরণের জন্য এই মায়া, কষ্ট ও পড়াশোনার পথ পাড়ি দিতেই হবে।
হলের খাবারে মনে পড়ে মায়ের কথা
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. রিফাত হোসাইন রিপন ২০২৫ সালের মার্চের শেষদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসেন। নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পরিচিত কেউ না থাকায় শুরুতে সবাইকেই অপরিচিত মনে হতো তার। পরে ভাইয়ের কটেজে ওঠেন এবং একই বিভাগের শিক্ষার্থী তাপস চন্দ্র রায়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিনগুলোতে পরিবারের কথা বেশি মনে পড়ত রিফাতের। বিশেষ করে খাবারের সময় মায়ের কথা মনে পড়ে। তিনি বলেন, হলের খাবার খেতে গেলেই মায়ের কথা বেশি মনে পড়ে। কারণ বাড়িতে থাকাকালে খাবার নিয়ে কখনো চিন্তা করতে হয়নি। অসুস্থ হলেও মায়ের কথা মনে পড়ে; তখন ফোনে কথা বললে কিছুটা স্বস্তি পান।
পরিবারের স্মৃতির সঙ্গে তার জীবনে রয়েছে বাবাকে হারানোর বেদনাও। রিফাতের বাবা মারা যান ২০২১ সালের ১৮ মার্চ। বন্ধুদের বাবার সঙ্গে কথা বলতে দেখলে নিজের বাবার কথা মনে পড়ে তার। তখন বড় ভাইদের ফোন করে কথা বলেন।
নতুন পরিবেশে থাকার জায়গা, খাবার এবং নিজেকে মানিয়ে নেওয়া-এসব সমস্যা সামনে এলেও বড় ভাই আগে থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করে রাখায় তাকে সেগুলোতে পড়তে হয়নি।
রিফাতের কাছে পরিবার ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা ছিল জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। প্রথমদিকে একাকিত্ব ও মন খারাপ থাকলেও সময়ের সঙ্গে নিজের দায়িত্ব নেওয়া এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে দেখছেন তিনি।
‘নিজের হাতে রান্না করতে গিয়ে মায়ের মূল্য বুঝেছি’
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ফারহানা মিষ্টির বাড়ি লালমনিরহাটে। পড়াশোনার জন্য তাকে থাকতে হচ্ছে নোয়াখালীতে। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গে এসে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি মা-বাবা ও পরিবারের কাছ থেকে দূরে থাকাটাই তার কাছে সবচেয়ে কঠিন।
ছোটবেলা থেকে মায়ের কাছে বেড়ে ওঠা ফারহানাকে নোয়াখালীতে এসে নিজের কাজ নিজেকেই করতে হচ্ছে। এর মধ্যে নিজের জন্য রান্না করা ছিল সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। এর আগে রান্নার অভিজ্ঞতা না থাকায় শুরুতে বিষয়টি কঠিন মনে হয়েছে তার।
নিজের হাতে রান্না করতে গিয়ে মায়ের প্রতিদিনের শ্রম ও যত্নের মূল্য নতুন করে উপলব্ধি করেছেন ফারহানা। মায়ের রান্না আগে স্বাভাবিক বিষয় মনে হলেও দূরে এসে সেই খাবারের জন্য এখন মন কাঁদে।
নোয়াখালীর আবহাওয়ার সঙ্গেও মানিয়ে নিতে হয়েছে তাকে। লালমনিরহাটের তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশের পর এখানকার গরম, আর্দ্রতা ও বৃষ্টির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া ছিল নতুন অভিজ্ঞতা।
তবে অসুস্থ হলে মায়ের কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। তখন মায়ের পাশে থাকার অনুভূতির অভাব তীব্রভাবে অনুভব করেন তিনি। দূরত্বের কারণে মন খারাপ হলেই বাড়ি যাওয়া সম্ভব হয় না। তাই অনেক সময় ফোনে মায়ের কণ্ঠ শুনেই নিজেকে সামলে নিতে হয়।
‘বাড়ি থেকে দূরে আসার সবচেয়ে বড় কষ্ট-মাকে ছেড়ে আসা’
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মো. তুহিন মিয়ার কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা শুধু উচ্চশিক্ষার যাত্রা নয়, পরিচিত নিরাপদ পরিবেশ থেকে নতুন বাস্তবতায় প্রবেশও।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে না এলে হয়তো বুঝতেন না-মায়ের আঁচল ও বাবার ছায়ার নিচে কতটা স্বস্তিতে ছিলেন। বাড়িতে খাবার বা টাকা-পয়সা নিয়ে চিন্তা করতে হতো না। নতুন শহর ও পরিবেশের সঙ্গে কিছুটা মানিয়ে নিতে পারলেও মেস, হল বা হোস্টেলের খাবারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেননি তিনি।
মায়ের হাতে তৈরি খাবারের কথা মনে পড়ে তার। অসুস্থ হলে মনে পড়ে মায়ের যত্নের কথাও। একা অসুস্থ অবস্থায় তখন মায়ের স্নেহ ও পাশে থাকার অভাব আরও বেশি অনুভূত হয়।
তুহিনের উপলব্ধি, বাড়ি থেকে দূরে আসা শুধু ডিগ্রি অর্জনের যাত্রা নয়; এটি পরিণত, স্বাবলম্বী ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠারও কঠিন পাঠশালা।
উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে ঘর ছাড়েন শিক্ষার্থীরা। নতুন শহর তাদের শেখায় নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে, প্রতিকূলতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে। কিন্তু সেই নতুন জীবনের প্রতিটি ধাপে কোথাও না কোথাও থেকে যায় বাড়ির স্মৃতি, মায়ের ডাক ও পরিবারের ভালোবাসা। স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে ঘর ছাড়তে হয়, কিন্তু মায়ের আঁচলের মায়া থেকে বেরিয়ে আসা যে কতটা কঠিন-দূরে থাকা শিক্ষার্থীদের জীবনকথনেই তার প্রতিচ্ছবি মেলে।
