প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৫ এএম
সজিব উদ্দিন
একসময় বিকেল নামলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠগুলো মুখর হয়ে উঠত শিক্ষার্থীদের পদচারণায়। কেউ ফুটবল, কেউ ক্রিকেট, কেউবা ব্যাডমিন্টন নিয়ে ছুটে যেতেন মাঠে। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, খেলাধুলা আর প্রাণবন্ত সময় কাটানো ছিল শিক্ষাজীবনের স্বাভাবিক অংশ। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর বিকেল কাটে মোবাইলের স্ক্রিনে কিংবা টিউশনের ব্যস্ততায়। মাঠভরা সেই বিকেল যেন ধীরে ধীরে স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি নিজের খরচ চালাতে টিউশন করেন অনেক শিক্ষার্থী। ক্লাস শেষে এক টিউশন থেকে আরেক টিউশনে ছুটতে হয় তাদের। দিনের ব্যস্ততা শেষে অবসর সময়টুকুও অনেকের কাটছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইউটিউব কিংবা অনলাইন গেমে। ফলে খেলাধুলা ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের জন্য সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
নোবিপ্রবির ফলিত গণিত বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইয়াছিন আরাফাত বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে স্কুল-কলেজের বন্দী জীবন থেকে মুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ক্লাস, এরপর টিউশন—সব মিলিয়ে অনেক সময় রাত ৯টা-১০টার আগে বাসায় ফেরা হয় না। এতে বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো ও নিজের জন্য রাখা সুন্দর মুহূর্তগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
খেলাধুলার সুযোগ-সুবিধার সংকটকেও শিক্ষার্থীদের মাঠবিমুখ হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। ইয়াছিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠ বছরের একটি বড় সময় ঘাস ও পানিতে নিমজ্জিত থাকে। মাঠ সংস্কারের অভাবে বিভিন্ন জায়গা উঁচু-নিচু হয়ে আছে। বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে মাঠ কর্দমাক্ত হয়ে যায়। ফলে খেলতে আগ্রহ থাকলেও মাঠের কারণে অনেক সময় খেলা সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরচর্চা বিভাগ থাকলেও তাদের শরীর আছে চর্চা নেই, নিয়মিত ও সময়োপযোগী ক্রীড়া আয়োজনের ঘাটতি রয়েছে। বছরে আয়োজন করা টুর্নামেন্টগুলোও অনেক সময় নির্ধারিত সময়ে শেষ হয় না। একটি টুর্নামেন্ট শেষ হতে পাঁচ-ছয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
শুধু খেলার মাঠ নয়, আবাসিক হলগুলোতেও পর্যাপ্ত ইনডোর স্পোর্টস সামগ্রী না থাকার অভিযোগ রয়েছে। ইয়াছিন বলেন, হলের টেবিল টেনিসে অনেক সময় বল থাকে না, ক্যারমের গুটিও পাওয়া যায় না। ফলে খেলতে গিয়েও হতাশ হয়ে ফিরে আসতে হয়। পরে রুমে ফিরে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব কিংবা অনলাইন গেমে সময় কাটানোর প্রবণতা তৈরি হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের মাঠবিমুখ হওয়ার পেছনে শুধু সুযোগ-সুবিধার সংকট নয়, সময়ের অভাবও বড় কারণ বলে মনে করেন অনেকে। নোবিপ্রবির বাংলা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাকিলা আক্তার প্রমি বলেন, ‘ক্লাস-পরীক্ষা কিংবা একাডেমিক কাজ শেষে অনেক সময় মানসিক ও শারীরিকভাবে ক্লান্তি অনুভব হয়। বাসায় বা হলে গিয়ে ফ্রেশ হওয়া, খাওয়ার পর একটু বিশ্রাম নিতে নিতে সময় কেটে যায়। যে বাকিটুকু সময় পাই, বিকেলে সেটা মোবাইলে, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা, ব্যক্তিগত কাজ কিংবা টিউশনের মধ্য দিয়েই যায়। তাই ইচ্ছে থাকলেও সময়ের স্বল্পতার কারণে বিকেলে খেলাধুলার জন্য আলাদা সময় বের করা হয়ে ওঠে না।’
আইন বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ শিকদার বলেন, অতিরিক্ত যন্ত্রনির্ভরতা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে আনতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগ প্রয়োজন। পড়াশোনার পাশাপাশি নিয়মিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মাঠ সংস্কার করে শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার। এতে শিক্ষার্থীদের একঘেয়েমি ও যান্ত্রিকতা অনেকটাই কমবে।
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শ্রেণিকক্ষ, পরীক্ষা ও ক্যারিয়ার প্রস্তুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য খেলাধুলার গুরুত্বও অপরিসীম। খেলাধুলা শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি দলগত কাজ, নেতৃত্বের গুণাবলি ও সামাজিক যোগাযোগ বাড়াতেও ভূমিকা রাখে।
নোবিপ্রবির মাঠগুলোর চিত্রেও শিক্ষার্থীদের পরিবর্তিত জীবনযাত্রার প্রভাব দেখা যায়। একসময় বিকেল হলেই যেসব মাঠে বড় দল নিয়ে খেলাধুলা হতো, এখন অনেক সময় সেসব মাঠ ফাঁকা পড়ে থাকে। হাতে গোনা কয়েকজন শিক্ষার্থী খেলাধুলা করলেও আগের মতো নিয়মিত ও বড় পরিসরের আয়োজন খুব একটা দেখা যায় না।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের এই পরিবর্তন কেবল একটি প্রজন্মের অভ্যাস বদলের গল্প নয়; এটি বদলে যাওয়া জীবনযাত্রারও প্রতিচ্ছবি। প্রযুক্তি ও ব্যস্ততার এই সময়ে প্রশ্ন থেকেই যায়—মোবাইলের স্ক্রিন, ক্লাস আর টিউশনের ব্যস্ততার ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মাঠভরা সেই বিকেলগুলো কি আবার ফিরবে?
