মঙ্গলবার ০৬, অক্টোবর ২০২৬

মঙ্গলবার ০৬, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে রাবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের ভাবনা

রাবিপ্রবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৯ পিএম

ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট

শিক্ষক শুধু একটি পেশার নাম নয়; একজন শিক্ষার্থীর জ্ঞান, চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম কারিগর। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পাশাপাশি জীবনের নানা বাঁকে সঠিক পথ দেখিয়ে শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস ও স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন একজন শিক্ষক। তাই শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য নির্দিষ্ট একটি দিন থাকলেও তাঁদের অবদান শিক্ষার্থীদের জীবনে থেকে যায় আজীবন।

প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় "বিশ্ব শিক্ষক দিবস"। দিবসটি উপলক্ষে রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবিপ্রবি) বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা তাঁদের কাছে শিক্ষকতার অর্থ, প্রিয় শিক্ষকদের অবদান এবং শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সম্পর্ক নিয়ে নিজেদের অনুভূতি জানিয়েছেন।

ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী মো. সামসিদ দোহা উৎস বলেন, “শিক্ষক দিবস শুধু শুভেচ্ছা জানানোর দিন নয়; এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন ভালো শিক্ষক শুধু পাঠ্যবই শেখান না, বরং একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, চরিত্র ও ভবিষ্যৎ গড়ে দেন। তাই শিক্ষকের প্রতি সম্মান শুধু একটি দিনের জন্য নয়, সারা জীবনের জন্য হওয়া উচিত।”

ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন রিসোর্সেস টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী সিয়াম মাহমুদ শিশির মনে করেন, শিক্ষক দিবস শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের পাশাপাশি কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও ভাবার সুযোগ তৈরি করে।

তিনি বলেন, “বিশ্ব শিক্ষক দিবস শুধু শিক্ষকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন নয়; বরং আমরা কেমন শিক্ষাব্যবস্থা চাই, সেটি নিয়ে ভাবারও একটি সুযোগ। একজন ভালো শিক্ষক শুধু একাডেমিক ফলাফল ভালো করতেই সাহায্য করেন না, তিনি একজন শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করতে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে এবং প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে শেখান।”

তিনি আরও বলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একজন শিক্ষক যেন শিক্ষার্থীর মধ্যে শুধু জ্ঞান নয়, চিন্তার স্বাধীনতাও তৈরি করেন। একইভাবে শিক্ষার্থীদেরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হয়ে জ্ঞানচর্চার পরিবেশ তৈরি করতে ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ একটি দেশের শিক্ষার মান শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয় শুধু কতজন শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করল তা দিয়ে নয়, বরং সেই শিক্ষা তাদের কতটা যুক্তিবাদী, মানবিক ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারল তা দিয়ে।”

কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী অর্ক দাশ গুপ্ত বলেন, “বিশ্ব শিক্ষক দিবস আমার কাছে শুধু শিক্ষকদের সম্মান জানানোর দিন নয়, তাঁদের অবদান নতুন করে উপলব্ধি করার দিন। একজন ভালো শিক্ষক শুধু জ্ঞান দেন না, তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ গড়ে দেন। তাই প্রতিটি শিক্ষকের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা—কারণ তাঁদের হাত ধরেই আগামী প্রজন্ম তৈরি হয়।”

ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী অদিতী চৌধুরীর কাছে শিক্ষক মানে শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদান নয়, বরং প্রয়োজনে একজন বন্ধুর মতো পাশে থাকা একজন পথপ্রদর্শক।

অদিতী বলেন, “শিক্ষক মানেই শুধু বইয়ের পাতার জ্ঞান শেখানো নয়; একজন শিক্ষক কখনো কখনো একজন বন্ধুর মতো—যিনি আমাদের ভুলগুলো বুঝবেন, আমাদের না-বলা কথাগুলোও অনুভব করবেন, আর প্রয়োজনের সময় সঠিক পথটা দেখাবেন।”

নিজের শিক্ষকতার ছোট্ট অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আজকের দিনটা আমার জন্য একটু বেশি বিশেষ। এতদিন শিক্ষক দিবসে শিক্ষার্থী হিসেবে আমার শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানিয়েছি। কিন্তু এবার টিউশনের মাধ্যমে নিজেও শিক্ষকতার ছোট্ট একটি অভিজ্ঞতার অংশ হতে পেরেছি। আর আজ যখন আমার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উপহার পেলাম, সত্যিই অন্যরকম ভালো লেগেছে। তখন বুঝলাম—একজন শিক্ষকের সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তি হয়তো উপহার নয়, বরং তার শিক্ষার্থীর ভালোবাসা ও সম্মান।”

এদিকে ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী সুকর্ন দেবনাথ শিক্ষক দিবসে স্মরণ করেছেন তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকদের। তাঁদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতি ও শাসনের আড়ালে থাকা ভালোবাসার কথা তুলে ধরেছেন তিনি।

সুকর্ন বলেন, “বেবি ম্যাম আমাদের বাসার পাশেই থাকতেন। তাই ছোটবেলায় ম্যামকে সবসময় একটু ভয়ই পেতাম—মনে হতো, বাসায় এসে কখন কী বলে দেন! তখন ম্যামের কথাগুলো সবসময় ভালোভাবে নিতাম না। কিন্তু এখন বুঝতে পারি, ম্যাম সবসময় আমার ভালোই চাইতেন। বলতেন, ‘বাবা, জীবনে অনেক বড় হতে হবে। কিছু একটা করে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করতে হবে।’ আজ বুঝি, সেই কথাগুলোর মধ্যে কতটা ভালোবাসা ও প্রত্যাশা ছিল।”

নিজের জীবনে শিক্ষকদের অবদানের কথা বলতে গিয়ে তিনি আরও বলেন, “তারেক স্যার, ইমরুল স্যার ও রুবেল স্যারকে আমি আলাদাভাবে স্মরণ করতে চাই। আমার জীবনে আপনাদের অবদান আমি কখনোই ভুলতে পারব না। আপনাদের শিক্ষা, পরামর্শ ও ভালোবাসা সবসময় মনে থাকবে।”

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শিক্ষক আরিফ স্যারের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন সুকর্ন। তিনি বলেন, “আরিফ স্যার—আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এখন পর্যন্ত পাওয়া অন্যতম সেরা শিক্ষক। স্যারের কাছ থেকে প্রতিদিনই নতুন কিছু না কিছু শিখছি। শুধু পড়াশোনা নয়, জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়েও স্যারের পরামর্শ আমাকে প্রতিনিয়ত আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা দেয়।”

শিক্ষার্থীদের কথায়, শিক্ষক দিবস কেবল শিক্ষকদের ফুল, শুভেচ্ছা বা উপহার দেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়। বরং এই দিনটি শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দেয়—তাঁদের জীবনের পেছনে থাকা অসংখ্য শিক্ষকের শিক্ষা, শাসন, পরামর্শ ও ভালোবাসার কথা। শ্রেণিকক্ষের পাঠ শেষ হয়ে গেলেও একজন শিক্ষকের দেওয়া শিক্ষা ও মূল্যবোধ অনেক সময় শিক্ষার্থীর জীবনের দীর্ঘ পথচলায় পথনির্দেশনা হয়ে থাকে।

Link copied!