প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ১২:৩৭ পিএম
যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া প্রাথমিক চুক্তির বিভিন্ন তথ্য ধীরে ধীরে প্রকাশ্যে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা হবে। একই সঙ্গে এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, চুক্তি কার্যকর হলে ইরান আবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেল রপ্তানি করতে পারবে।
চলতি সপ্তাহে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তবে এর আওতায় এপ্রিল মাসে কার্যকর হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিনের জন্য বাড়ানো হয়েছে, যেন দুই দেশ একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে।
প্রাথমিক সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করবে। এর বিনিময়ে ইরান হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী ট্যাংকারসহ অন্যান্য জাহাজের স্বাভাবিক চলাচল নিশ্চিত করবে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে তেহরান কার্যত এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে চলাচল সীমিত করে রেখেছিল।
ট্রাম্প বলেছেন, চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে ইরানের কাছে কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকবে না। তিনি জানান, কয়েক দিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রকাশ করা হবে।
অন্যদিকে ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি কেবল শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং তারা কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেনি।
ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর পক্ষে ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন যুক্তি দিলেও পর্যবেক্ষকদের মতে, ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর বেশির ভাগই এখনো অর্জিত হয়নি। ইরানের সরকার ক্ষমতায় বহাল রয়েছে, দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিও অক্ষত রয়েছে। একই সঙ্গে হিজবুল্লাহসহ আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তেহরানের সমর্থনও বন্ধ হয়নি।
নতুন এই চুক্তি ট্রাম্পকে নিজ দলের মধ্যেও সমালোচনার মুখে ফেলতে পারে। কারণ আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।
ইরানের নেতৃত্বও চাপের মধ্যে রয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং জনগণের অর্থনৈতিক দুর্ভোগ কমাতে ব্যর্থ হলে দেশটির নেতাদের নতুন করে গণবিক্ষোভের মুখে পড়তে হতে পারে।
ইসরায়েল সরাসরি এই আলোচনায় অংশ নেয়নি। দেশটি এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি এবং সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি—উভয় ক্ষেত্রেই নিজেদের দূরে রেখেছে। ফলে নতুন যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশ এই সংঘাতের প্রভাব অনুভব করেছে। সংঘর্ষে সাত হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যাদের বেশির ভাগই ইরান ও লেবাননের নাগরিক। মার্চ মাসে ইরানের মিত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ যুদ্ধে যুক্ত হওয়ার পর ইসরায়েল লেবাননে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছেন, চুক্তির আওতায় ইসরায়েল ও লেবাননের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে বাধ্য নয় এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই।
হিজবুল্লাহর এক মুখপাত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি উপস্থিতি অব্যাহত থাকলে ইরান স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হবে বলে তারা মনে করেন না।
এদিকে ইরানের সামরিক কমান্ডের কেন্দ্রীয় দপ্তর খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ লেবাননে হামলা অব্যাহত থাকলে ইসরায়েলকে কঠোর প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চুক্তি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইরান তেল ও অন্যান্য জ্বালানি রপ্তানি পুনরায় শুরু করতে পারবে। এ ছাড়া তেল বিক্রি সহজ করতে ব্যাংকিং, পরিবহন ও বিমা-সংক্রান্ত সেবাও পুনরায় চালুর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের মতে, ভবিষ্যতে এই চুক্তি ইরানের জন্য উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধার পথ খুলে দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং বিদেশে জব্দ থাকা সম্পদ মুক্ত করার সম্ভাবনা।
চুক্তির শর্তগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন তহবিল গঠনের সুযোগও তৈরি হতে পারে। উপসাগরীয় যেসব দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে এবং যুদ্ধের সময় যেগুলো ইরানের হামলার শিকার হয়েছিল, সেসব দেশ এই তহবিলে অর্থায়ন করবে বলে জানা গেছে।
কঠিন আলোচনা এখনো বাকি
আগামী ৬০ দিনে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ। যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারিতে ইরান ও ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধিরা এ বিষয়ে আলোচনা করছিলেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্তের কারণে সেই আলোচনা মাঝপথে থেমে যায়।
তবে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যুদ্ধের পক্ষে যেসব যুক্তি তুলে ধরেছিলেন, তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়-ইরানের আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন বন্ধ করা এবং ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা-বর্তমান আলোচনার এজেন্ডায় নেই বলেই মনে হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর সমালোচনাও করেছেন। মঙ্গলবার তিনি বলেন, ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের বর্তমান ধারা নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন।
ইরানের সঙ্গে পরবর্তী ধাপের আলোচনা প্রসঙ্গে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরান চুক্তি করতে আগ্রহী।’ যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তিনি এ ধরনের মন্তব্য করে আসছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘তাদের আবার ব্যবসা-বাণিজ্যে ফিরতে হবে। এখন সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছে। তাই আমি মনে করি, আলোচনা দ্রুত এগোবে।’ এর আগে ট্রাম্প এই চুক্তিকে ইরানের জন্য “পারমাণবিক অস্ত্রের পথে একটি দেয়াল” বলে বর্ণনা করেছিলেন।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
