নোবিপ্রবি থেকে রাকিব মোহাম্মদ আরজু
প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২৬ পিএম
মঙ্গলবার ০৬, অক্টোবর ২০২৬ -- : -- --
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার দুই দশক পার হলেও শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনে এখনো কার্যকর ও স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি)। প্রায় সাড়ে ৯ হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি আবাসিক হলে আসন রয়েছে মাত্র ২ হাজার ৬৫০টি। ফলে প্রায় ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থীই আবাসিক হলের আসন সুবিধার বাইরে রয়েছেন।
২০০১ সালে নোয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৩৩টি বিভাগে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও সে তুলনায় আবাসিক সুবিধা বাড়েনি। ফলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে মেস, হোস্টেল বা ভাড়া বাসায় থাকতে হচ্ছে। এতে তাদের পড়াশোনার ব্যয়ের পাশাপাশি বাসস্থান, খাবার, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও যাতায়াত খরচও বহন করতে হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, নোবিপ্রবির পাঁচটি আবাসিক হলে মোট ২ হাজার ৬৫০টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম হলে ৪৩০টি, বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মালেক উকিল হলে ৫১১টি, হযরত বিবি খাদিজা হলে ৪৩৫টি, নবাব ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী হলে ৬১০টি এবং জুলাই শহীদ স্মৃতি ছাত্রী হলে ৫২০টি আসন রয়েছে। এসব আসনের মধ্যে ডাবলিং ও ফ্রেশার্স রুমের ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি হলের মধ্যে দুটি ছাত্রদের এবং তিনটি ছাত্রীদের জন্য। আসনসংখ্যার তুলনায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় আবাসিক হলের একটি আসন অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই যেন ‘সোনার হরিণ’। বিশেষ করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য মেস বা ভাড়া বাসার অতিরিক্ত খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
প্রথম বর্ষেই মেলেই না হলের আসন
আবাসন সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে নবীন শিক্ষার্থীদের ওপর। ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য মোট শূন্য আসনে অনূন্য ৫% আসন সংরক্ষিত থাকলে ও তা সহনীয় মাত্রা নয় ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর প্রথম বর্ষ থেকেই হলের আসনের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। ফলে উচ্চশিক্ষার জন্য নোয়াখালীতে আসা শিক্ষার্থীদের শুরুতেই আবাসন নিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে অসচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন। পরিবারের সীমিত আয়ের কারণে শহরের মেস বা হোস্টেলের ব্যয় বহন করা তাদের পক্ষে অনেক সময় সম্ভব হয় না। ফলে আবাসন ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে তাদের পড়াশোনার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
এ বিষয়ে আইন বিভাগের ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী তাজভীর আহমেদ বলেন,“বগুড়া থেকে নোয়াখালীতে পড়াশোনা করতে এসেছি আমি। আমাদের মতো দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যাম্পাসের আবাসিক হল অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। হলে সিট না পাওয়ায় আমার মাইজদীতে থাকতে হচ্ছে, ফলে অতিরিক্ত অর্থ ও সময় ব্যয় হচ্ছে, এক প্রকার হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। একজন স্টুডেন্ট হিসেবে আমি লেখাপড়ায় করব নাকি এগুলো নিয়ে টেনশন করব!”
তিনি আরো বলেন, “প্রতিদিন দীর্ঘ সময় যাতায়াতের কারণে শারীরিক ক্লান্তি তৈরি হয়, যা পড়াশোনায় মনোযোগের ওপরও প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি ক্যাম্পাস থেকে দূরে থাকায় সহশিক্ষা কার্যক্রম ও খেলাধুলায় নিয়মিত অংশ নেওয়া সম্ভব হয় না। একজন শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন শুধু থাকার জায়গা নয়; এটি তার পড়াশোনা, মানসিক স্বস্তি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।”
বাংলা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ওয়ারিয়া বিনতে দেলোয়ার বলেন,“শিক্ষার স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে সূদর ময়মনসিংহ থেকে নোয়াখালীতে আসা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার পাশাপাশি থাকার বিষয়টিও একজন শিক্ষার্থীর জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত হল না থাকায় বাধ্য হয়ে আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দূরে মেসে থাকতে হচ্ছে যার জন্য বাসা ভাড়া, খাওয়া-দাওয়া, যাতায়াতের খরচ মিলিয়ে পরিবারের ওপর চাপ পড়ে। এর পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতা, যাতায়াত সমস্যা, বাসে ভিড় এবং অন্যান্য বিষয় নিয়ে হয়রানি ইত্যাদি পরিস্থিতির জন্য পড়াশোনায় ব্যাহত ও বিলম্ব সৃষ্টি হয়।”
তিনি আরো বলেন,“প্রশাসনের উচিত শিক্ষার্থীদের এই সমস্যাগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা এবং পর্যাপ্ত আবাসিক হলের ব্যবস্থা করা। বিশেষ করে নতুন হল নির্মাণ ও আবাসনব্যবস্থা বাড়ানো হলে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের অনেক উপকার হবে।”
আবাসিক সমস্যা সমাধানের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, “নোবিপ্রবিতে আবাসিক হলের সংকট রয়েছে। এ সংকট নিরসনে নতুন হল নির্মাণের জন্য প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ছেলেদের জন্য দুটি এবং মেয়েদের জন্য দুটি মোট চারটি আবাসিক হল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নির্মাণের জন্যও একটি প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে আমাদের কাজ করতে হবে। ইনশাআল্লাহ, প্রকল্পগুলো অনুমোদন করিয়ে এনে ধীরে ধীরে আবাসিকসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য সমস্যার সমাধান করা হবে।”