প্রকাশিত: ৩০ জুন ২০২৬, ১১:১৭ এএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) শেখ পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা পাঁচটি স্থাপনার নাম পরিবর্তন ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পর্ষদ সিনেটের বার্ষিক অধিবেশনে বেশ কয়েকজন সিনেট সদস্যের মধ্যে বাদানুবাদের ঘটনা ঘটেছে। এদিকে অধিবেশনে স্থাপনাগুলো নাম পরিবর্তনে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নেওয়া হলে অধিবেশন ওয়াক আউট করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদের (ডাকসু) নির্বাচিত পাঁচ প্রতিনিধি।
সোমবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সিনেট অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে এসে বাদানুবাদের এক পর্যায়ে ওয়াকআউট করেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদ, এজিএস মুহাম্মদ মহিউদ্দিন, পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ ও সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না।
পরে সাংবাদিকদের ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, ‘স্থাপনাগুলোর নাম পরিবর্তনের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট (সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম) এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে সিনেটে পাঠায়। কিন্তু এ বিষয়ে কোন আলোচনা না করেই সেটিকে সিনেট থেকে আবার সিন্ডিকেটে পাঠানো হয়েছে। আমরা বুঝতে পারছি না ফ্যাসিবাদের আইকনদের প্রতি তাদের কেন এত দরদ। তারা বারবার আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় যাচ্ছেন। এজন্য আমরা সিনেট অধিবেশনে ওয়াক আউট করছি।’
এদিকে রাত সাড়ে ১২টার দিকে গণমাধ্যমে পাঠানো ডাকসুর ভিপি-জিএস এবং এজিএস স্বাক্ষরিত এক যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, ‘আমাদের এই ওয়াক আউট কোনো ব্যক্তিগত প্রতিবাদ নয়। বরং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি, জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা এবং ফ্যাসিবাদমুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি আমাদের নৈতিক অবস্থানের প্রকাশ।’
এর আগে ওই বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘শেখ মুজিবের নামে হল বহাল থাকায় সংশ্লিষ্ট হলের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত যে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে ট্যাগিং, হেনস্তা ও ভিকটিমাইজেশনের শিকার হচ্ছে তা তুলে ধরার পরেও বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। এমনকি মহান বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাওয়ার সময়ও হলের ব্যানার ছিনিয়ে নেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে শুধুমাত্র ফ্যাসিবাদী আইকনের নাম হলের নাম বহাল থাকায়। জুলাই বিপ্লব পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে ফ্যাসিবাদী আইকনদের প্রতি প্রশাসনের এই সুপ্ত দরদ জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের চেতনার সাথে সুস্পষ্ট প্রতারণা।’
জানা গেছে, ডাকসু ও শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে গত ৮ জানুয়ারি সিন্ডিকেটের সভায় শেখ পরিবারের নামে থাকা ৫টি স্থাপনার নাম পরিবর্তনের বিষয়টি সিনেটে উত্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়। সিন্ডিকেটের ওই সভায় নাম পরিবর্তনের ব্যাপারে কোন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিষয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সিনেটে পাঠানো হয়।
স্থাপনাগুলো হলো— শেখ মুজিবুর রহমান হল, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল, শেখ রাসেল টাওয়ার, বঙ্গবন্ধু টাওয়ার এবং ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির শহীদ অ্যাথলেট সুলতানা কামাল হোস্টেল।
সিনেটের বার্ষিক অধিবেশন চলাকালে শেষ এজেন্ডা হিসেবে নাম পরিবর্তনের বিষয়টি তোলেন অধিবেশনের সভাপতি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সিন্ডিকেট এ ব্যাপারে সিনেটের কাছে বিষয়টি প্রেরণ করেছেন। তারা অনুমোদন করেননি। এ বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য জানতে চাই।’
এর প্রেক্ষিতে সিনেট সদস্য এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমান বলেন, ‘এই সিদ্ধান্তটি সিন্ডিকেট নেবে। বিযয়টি তো প্রসিডিওর মেইনটেইন করে আসবে এবং এখানে আমরা অনুমোদন করব। তাই আমার মনে হয়, এই বিষয়টি আর এখানে আলোচনার বিষয় থাকে না।’
নাম পরিবর্তনে সিনেট সদস্য অধ্যাপক সামিনা লুৎফার আপত্তি: ওই পাঁচ স্থাপনার নাম পরিবর্তনে আপত্তি জানান বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং সিনেট সদস্য সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তীতে সময়ে আমাদের একটি প্রত্যাশা ছিল আমরা কোন স্বৈরশাসন, ইনজাস্টিসের মধ্য দিয়ে যাবো না। যেন কখনোই কোন দলীয় মতাদর্শের কারণে কোন ইনজাস্টিসের শিকার না হন। এখন শেখ মুজিবুর রহমান ৮০ দশকে হয়তো নামকরণ করা এবং এটি তো শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হলে পাশেই। পাশাপাশি দুটো হল, এটি তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অংশ। এই ইতিহাসের অংশ একটি জিনিসকে এভাবে আলোচনাহীনভাবে চট করে বদলানো যায় না। এটি খুবই খারাপ দৃষ্টান্ত।’
পরবর্তী কয়েক দফাতে ডাকসুর ভিপি-জিএস নাম পরিবর্তনে একাধিকবার আলোচনার উপর জোরালো দাবি তোলেন। এক পর্যায়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘সিন্ডিকেটকে বাইপাস করে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। বিধি অনুযায়ী বিষয়টি আগে সিন্ডিকেটে যাবে, এরপর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত হবে।’
উপাচার্যের এমন বক্তব্যের পর অসন্তোষ প্রকাশ করে সিনেট অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন সিনেট সদস্য এবং ডাকসুর পাঁচ প্রতিনিধিরা। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বারবার অনুরোধ করলেও তা রাখেননি ছাত্র প্রতিনিধিরা।
উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ছাত্রদের জন্য ১৪ টি এবং ছাত্রীদের জন্য ৫ টি আবাসিক হল রয়েছে। এছাড়া চারুকলা অনুষদ, ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট ও লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউটের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য রয়েছে আলাদা হোস্টেল এবং বিদেশী ছাত্রদের জন্য রয়েছে আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাস।
এর মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে শহিদ ওসমান হাদি হল, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের নাম বীরপ্রতীক ক্যাপ্টেন সেতারা বেগম হল, শেখ রাসেল টাওয়ারের নাম অফিসার্স টাওয়ার, বঙ্গবন্ধু টাওয়ারের নাম শহিদ মিনার টাওয়ার এবং ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির শহীদ অ্যাথলেট সুলতানা কামাল হোস্টেলের নাম শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হোস্টেল নামকরণের প্রস্তাব করা হয়। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়টিতপ বিভিন্ন সময়ে শেখ পরিবারে থাকা স্থাপনাগুলোর নাম পরিবর্তনে ডাকসু ও হল সংসদ নেতারা একাধিকবার বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করে। এছাড়া হলগুলোর নাম পরিবর্তন এবং কি নাম রাখা হবে, এ নিয়ে গণস্বাক্ষর কর্মসূচিও পালন করে হলগুলোর শিক্ষার্থীরা।
