প্রকাশিত: ২৩ মে ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ভারতের কর্মসংস্থানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে বড় ধরনের চাপে ফেলেছে। একদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত বহু ভারতীয় শ্রমিক দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন, অন্যদিকে চামড়াজাত পণ্য, কাচশিল্পসহ বিভিন্ন উৎপাদিত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমতে শুরু করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মসংস্থান এবং জুতা ও পোশাকশিল্পের মতো শ্রমনির্ভর উৎপাদন খাতের বৈশ্বিক চাহিদা ভারতের লাখো মানুষের জন্য স্থায়ী আয়ের উৎস ছিল। অনেক পরিবার এই আয়ের ওপর নির্ভর করেই নিজেদের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করেছে।
তবে সাম্প্রতিক সংঘাত ভারতের অর্থনীতিতে দ্বিমুখী প্রভাব ফেলছে। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে দেশে ফিরে আসা শ্রমিকরা নিজ এলাকায় আগের সমমানের আয় করতে পারছেন না। এতে বেকারত্বের পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার আশঙ্কাও বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সৌদি আরবের একটি গয়নার দোকানে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত কাজ করেছেন মোহাম্মদ কুরেশি। মাসে প্রায় ৩০ হাজার রুপি আয় করে তিনি একটি ছোট বাড়ি নির্মাণ ও বোনের বিয়ের খরচের জন্য সঞ্চয় করেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতির পরিবর্তনে তাকেও দেশে ফিরতে হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে মানুষের ভোগব্যয় কমে যেতে পারে এবং উত্তর ভারতে সম্প্রতি দেখা দেওয়া বিক্ষোভের মতো সামাজিক উত্তেজনাও বাড়তে পারে।
উত্তর প্রদেশের শিল্পনগরী কানপুরে এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিদেশে খেলাধুলার সামগ্রী ও অন্যান্য পণ্য সরবরাহকারী চামড়াজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান কিংস ইন্টারন্যাশনালের মালিক তাজ আলম জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে জ্বালানি, গ্যাস, পরিবহন ও শিপিং ব্যয় বেড়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় মুনাফা উল্লেখযোগ্যভাবে সংকুচিত হয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ২০০টি চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে কারখানাটি অর্ধেক সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। আগে যেখানে ৫০০-এর বেশি শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে প্রায় অর্ধেক কর্মী রয়েছেন। ফলে নতুন বিনিয়োগ কিংবা নিয়োগে আগ্রহও কমে গেছে।
তাজ আলম বলেন, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। তার মতে, অনিশ্চিত পরিবেশে নতুন বিনিয়োগ করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
কাউন্সিল ফর লেদার এক্সপোর্টসের সহসভাপতি মুখতারুল আমিন জানান, কানপুর থেকে ভারতের প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক চামড়া রপ্তানির এক-চতুর্থাংশ সরবরাহ করা হয়। এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত।
তিনি বলেন, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান এখনো কর্মী ছাঁটাই এড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে নিয়োগ ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবাই সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
বিদেশে কর্মরত প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ভারতীয়ের মধ্যে প্রায় ৯০ লাখই উপসাগরীয় অঞ্চলে কাজ করেন। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৪.৪ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ১.৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এতে কর্মসংস্থানের ওপর আরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নিয়োগদাতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার পর পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন নিয়োগ স্থগিত রেখেছে। একই সঙ্গে পরিবারগুলোও বিদেশে কাজের জন্য অর্থ ব্যয় করতে দ্বিধায় পড়ছে।
কানপুরের হায়াত প্লেসমেন্ট সার্ভিসেসের নিয়োগদাতা গৌতম বাটাগার বলেন, বর্তমানে দেশে ও বিদেশে—দুই ক্ষেত্রেই চাকরির সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
সরকারিভাবে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কতজন ভারতীয় শ্রমিক দেশে ফিরেছেন, তার নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২৮ ফেব্রুয়ারি সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখ ভারতীয় দেশে ফিরেছেন। এদের মধ্যে শ্রমিক, যাত্রী ও অন্যান্য ভ্রমণকারীও রয়েছেন।
এই অনিশ্চয়তার প্রভাব দক্ষিণ ভারতের কেরালা রাজ্যেও পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা রেমিট্যান্স কেরালার অর্থনীতির বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
থমাস চেরিয়ান নামের ৫০ বছর বয়সী এক কর্মী সৌদি আরবে একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে ১৮ বছর কাজ করার পর গত ডিসেম্বরে ছুটিতে দেশে ফেরেন। মার্চে তার কাজে ফেরার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্প বন্ধ করে দেয় এবং প্রায় ৬০০ ভারতীয় কর্মীকে ছাঁটাই করে। তিনি জানান, জুনের শেষ নাগাদ কাজে ফিরতে না পারলে তার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে।
কেরালার প্রবাসী কল্যাণ সংস্থা নোরক রুটের প্রধান নির্বাহী অজিত কোলাসারি বলেন, এখনো ব্যাপকহারে কেউ দেশে ফেরেননি। তবে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনৈতিক চাপের কারণে বড় ধরনের প্রত্যাবাসন ঘটতে পারে, যা কেরালার চাকরির বাজারকে আরও সংকটে ফেলবে।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর সময়ে বিদেশে থাকা ভারতীয়দের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমাণ ছিল ১০২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল ৯২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। যদিও জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ের তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মুদি সরকারের জন্য এই পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক চাপও তৈরি করছে। ভারতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি। দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কৃষির বাইরে বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা দেশটির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ান এন্টারপ্রেনিউরসের চেয়ারম্যান কেই রগুনাতান বলেন, এটি শুধু সাময়িক অর্থনৈতিক মন্দা নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), দুর্বল বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিদেশি শ্রমবাজার-সব ক্ষেত্রেই প্রচলিত চাকরির সুযোগ কমে যাচ্ছে।
ভারতের বেকারত্বের হার ফেব্রুয়ারির ৪.৯ শতাংশ থেকে এপ্রিল মাসে বেড়ে ৫.২ শতাংশে পৌঁছেছে। শহুরে তরুণদের মধ্যে এই হার প্রায় ১৪ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অনেক শিক্ষিত তরুণ এখন কম বেতনের বা অনিরাপদ চাকরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব ফরেন ট্রেডের অর্থনীতিবিদ রাম সিং বলেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে চাকরির অনিশ্চয়তা, রপ্তানিতে ঝুঁকি এবং ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন, পরিবহন ও বাণিজ্যনির্ভর খাতে নতুন নিয়োগ আরও কমে যেতে পারে।
তার মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো মজুরি বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, বিশেষ করে কম দক্ষতা ও নিয়মিত অফিসভিত্তিক কাজগুলোতে। কারণ এসব কাজ এআইনির্ভর স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি শ্রমবাজারে অতিরিক্ত কর্মীর উপস্থিতি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নমনীয় কর্মী চাহিদার কারণে ভবিষ্যতে চুক্তিভিত্তিক, গিগ ও অনানুষ্ঠানিক কাজ আরও বাড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
জেএস
