প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৮ পিএম
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জয়ন্তী উপলক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ’ (২০২৬–২০২৭) উদযাপনে বছরব্যাপী অনুষ্ঠানমালার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আজ বুধবার (২২ জুলাই ২০২৬) দিনব্যাপী চবি সমাজবিজ্ঞান অনুষদ অডিটোরিয়ামে সেমিনার ও নজরুল সঙ্গীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। সকাল ১০টায় সেমিনার শুরু হয় এবং এরপর দুপুর ২টায় সাংস্কৃতিক পর্ব শুরু হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন ও ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সালেহ্ জহুর। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এবং চবি নজরুল বর্ষ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল্-ফোরকান সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আজকের দিনটি একটি বিশেষ দিন। বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত ‘নজরুল বর্ষ’ যথাযোগ্য মর্যাদায় উদযাপনের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বছরব্যাপী নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, একটি প্রশ্ন আমাকে সবসময় ভাবায় কাজী নজরুল আসলে কিসের কবি? কেউ বলবেন তিনি প্রেমের কবি, কেউ বলবেন বিরহের কবি। কেউ বলবেন ধর্মের কবি, আবার কেউ বলবেন ধর্মনিরপেক্ষতার কবি। কেউ তাঁকে সাম্যের কবি হিসেবে চিহ্নিত করবেন, কেউ বিদ্রোহের কবি, কেউ স্বাধীনতার কবি, কেউবা তারুণ্যের কবি। আবার তাঁর কীর্তন, হামদ-নাত, শ্যামাসংগীত কিংবা ইসলামী সংগীত শুনলে মনে হয় তিনি মানবতার কবি, সম্প্রীতির কবি। অর্থাৎ আপনি যেদিক থেকেই তাঁকে দেখবেন, তিনি সেই দিকেই আপনাকে আলো দেখাবেন।
উপাচার্য বলেন, নজরুল তাঁর সাহিত্য ও দর্শনের মাধ্যমে সাম্য, ন্যায়, মানবিকতা এবং নারী-পুরুষের সমঅধিকারের যে চেতনা তুলে ধরেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর সেই অমর উচ্চারণ ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’ আজকের পৃথিবীর সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বহু আগে তিনি যে ‘ইকুইটি’ বা ন্যায্যতার কথা বলেছেন, আজকের বিশ্বও সেই একই মূল্যবোধ ধারণ করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-গবেষণা নিয়ে উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদানের স্থান নয়; এটি গবেষণা, সৃজনশীলতা এবং নেতৃত্ব বিকাশেরও কেন্দ্র। আমাদের শিক্ষার্থীদের আরও বেশি করে সহশিক্ষা কার্যক্রম, ক্লাবভিত্তিক কর্মকাণ্ড এবং গবেষণার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে আমি দেখেছি, শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ক্লাব ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা বিকাশে ব্যস্ত থাকে। আমরাও চাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুল ক্লাব, রবীন্দ্র ক্লাব, বিজ্ঞান ক্লাব, বিতর্ক ক্লাবসহ বিভিন্ন সৃজনশীল প্ল্যাটফর্ম আরও শক্তিশালী হোক। তিনি আয়োজকসহ সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল-আমীন সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, কাজী নজরুল ইসলাম এমন এক বিরল প্রতিভার অধিকারী, যাঁকে আমরা একই সঙ্গে বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি, সাম্যের কবি এবং মানবতার কবি হিসেবে জানি। একজন মানুষের মধ্যে এত বৈচিত্র্যময় প্রতিভার সমন্বয় সত্যিই বিস্ময়কর। স্বশিক্ষিত, দারিদ্র্যপীড়িত শৈশব অতিক্রম করেও তিনি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করেছিলেন। তাঁর কবিতা কেবল সাহিত্য নয়, সমাজেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
তিনি বলেন, যুগে যুগে সমাজ যখন যে প্রেরণার প্রয়োজন অনুভব করেছে, নজরুল তাঁর কলমের মাধ্যমে সেই প্রেরণাই যুগিয়েছেন। যখন জাতিকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়োজন হয়েছে, তখন নজরুলের কবিতার মতো শক্তিশালী আহ্বান আর কোথাও পাওয়া যায়নি। আবার যখন সমাজে অন্যায়, বৈষম্য ও শোষণ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তখন তাঁর কবিতা প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, সামাজিক অবিচার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন।
স্বাগত বক্তব্যে অনুষ্ঠানের সভাপতি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও অনুষ্ঠান কমিটির আহ্বায়ক প্রফেসর ড. মো. সফিকুল ইসলাম সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের জাতির প্রেরণা, সাহস এবং চেতনার এক অনন্য উৎস। তাঁর কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্মে বাংলাদেশের মানুষের জীবনবোধ, সংগ্রাম, সংস্কৃতি ও আত্মমর্যাদার প্রতিফলন ঘটেছে। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অগ্নিঝরা কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, আত্মমর্যাদাবোধ এবং গণজাগরণের চেতনা সৃষ্টি করেন। তিনি জনগণকে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস জুগিয়েছিলেন। তাই আজও তাঁর সেই অমর উচ্চারণ “বল বীর, বল উন্নত মম শির” আমাদের স্বাধীনতা, সাহস ও আত্মবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে আছে। সমাপনী বক্তব্যে তিনি সকলকে আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
'দেশপ্রেম, মানবতা ও গণজাগরণে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম' শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট নজরুল গবেষক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ নুরুল আমিন। তিনি কাজী নজরুলের সাম্য, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বিপ্লবী সাহিত্যকর্মের ওপর আলোকপাত করেন। প্রবন্ধের উপর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশ নেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আনোয়ার সাঈদ এবং বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. তাসলিমা বেগম।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন চবি নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ফরিদুদ্দিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সঙ্গীত বিভাগের সভাপতি মিশকাতুল মমতাজ।
আলোচনা পর্ব শেষে দুপুর ২টা থেকে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। এতে নজরুল সঙ্গীত পরিবেশন করেন প্রখ্যাত নজরুল সঙ্গীত শিল্পী ফেরদৌস আরা। এছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে নজরুলের গান ও চিত্তাকর্ষক নৃত্যআলেখ্য পরিবেশিত হয়।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদসমূহের ডিনবৃন্দ, হলের প্রভোস্টবৃন্দ, প্রক্টর, ছাত্র-ছাত্রী পরামর্শ ও নির্দেশনা পরিচালক, বিভাগ/ইনস্টিটিউটের সভাপতি/পরিচালকবৃন্দ, হলের আবাসিক শিক্ষকবৃন্দ, অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ, চাকসুর প্রতিনিধিবৃন্দ, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ, নাট্যকলা ও সঙ্গীত বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ এবং বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
