প্রকাশিত: ২২ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৯ পিএম
ময়মনসিংহে বর্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু সংক্রমণ। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের তুলনায় শুধু জুলাই মাসের প্রথম তিন সপ্তাহেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন অনেক বেশি রোগী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নগরের ছয়টি ওয়ার্ডকে ‘স্পেশাল জোন’ ঘোষণা করে বিশেষ মশকনিধন কার্যক্রম শুরু করেছে সিটি করপোরেশন।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মোট ৩৪৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু জুলাই মাসের প্রথম তিন সপ্তাহেই ভর্তি হয়েছেন ২২০ জন, যেখানে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১২৬।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ বছর হাসপাতালে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে একজন, জুনে তিনজন এবং জুলাই মাসে একজন মারা যান।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিবছরের মতো এবারও জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। গত বছর জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে ডেঙ্গু রোগী ছিল ১৭৬ জন এবং মৃত্যু হয়েছিল একজনের। তবে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ২ হাজার ২২৭ জন এবং প্রাণ হারান ২৮ জন।
বুধবার সকাল ৭টা পর্যন্ত হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩৯ জন রোগী। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন ভর্তি হয়েছেন ১০ জন, আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১১ জন।
নগরের ৬ ওয়ার্ডে বিশেষ নজর
সংক্রমণের ঝুঁকি বিবেচনায় ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নগরের ৬, ১০, ১১, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ওয়ার্ডকে ‘স্পেশাল জোন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত মাত্র চারজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেও জুনে আক্রান্ত হন আটজন এবং ২১ জুলাই পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৮ জনে। চলতি বছরে নগরে মোট আক্রান্ত হয়েছেন ৭০ জন এবং একজনের মৃত্যু হয়েছে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. রুকুনোজ্জামান রোকন বলেন, "গত বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্পেশাল জোন চিহ্নিত করা হয়েছে। মশার বংশবিস্তারের ঝুঁকি বেশি থাকায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে স্পেশাল জোনে দিনে দুবেলা মশকনিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ফগিংয়ের পাশাপাশি স্প্রে করা হচ্ছে। আশপাশ পরিষ্কার রাখতে বাড়ি বাড়ি লিফলেটও পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।"
নওমহলে মশার উৎপাত, আতঙ্কে বাসিন্দারা
স্পেশাল জোনের অন্তর্ভুক্ত নওমহল এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, অনেক নালায় আবর্জনা জমে থাকায় সেখানে মশার বংশবিস্তার হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. বিল্লাল বলেন, "ডেঙ্গুতে অনেক মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। কিছুদিন আগে এক নারী মারা গেছেন। মশার জন্য রাতের বেলায় বিরাট ভয় করে। মশার ওষুধ দিলেও মশা মরে না।"
একই এলাকার বাসিন্দা সুফিয়া খাতুন বলেন, "মশার ভয়ে সারা রাত ঘুমাইতে পারি না। দিনে কম মশা ধরলেও রাতে বেশি ভয় থাকে। ডেঙ্গু মশার লাগিই আমাদের ভয়। সিটি করপোরেশন থেকে ওষুধ দিয়া গেলেও মশা তো মরে না।"
২০ শয্যার ওয়ার্ডে রোগী ৩৯ জন
রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় ২ জুলাই থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু ওয়ার্ড চালু করা হয়েছে।
২০ শয্যার এই ওয়ার্ডে বুধবার সকাল পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ৩৯ জন রোগী। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২ জুলাই থেকে বুধবার দুপুর পর্যন্ত মোট ২৪২ জন রোগী এই ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১০৩ জন ময়মনসিংহ জেলার এবং প্রায় ৫৬ শতাংশ রোগী সিটি করপোরেশন এলাকার বাসিন্দা।
আক্রান্তদের অভিজ্ঞতা
আকুয়া দরবার শরিফ রোডের বাসিন্দা স্কুলশিক্ষক আবদুল আউয়াল জানান, আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার পর মশার কামড়ে আক্রান্ত হয়ে তাঁর ডেঙ্গু ধরা পড়ে।
তিনি বলেন, "বাসায় ফেরার পর রাতেই জ্বর শুরু হয়। স্বাভাভিক জ্বর মনে করলেও পরদিন জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে ডেঙ্গু হয়েছে। প্ল্যাটিলেট নেমে দাঁড়ায় ৬৮ হাজারে।"
ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাকিব হোসেন গাজীপুরে কাজ করতে গিয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
তিনি বলেন, "বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় রাতের বেলায় আমাকে মশা কামড় দিয়েছে মনে হয়েছিল। কামড় দেওয়ার পরদিন দুপুর থেকেই আমার জ্বর। পরে পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে।"
হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদার
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. মাইনউদ্দিন খান বলেন, "এই মৌসুমে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায় বেশি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিমধ্যে পৃথক আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করে চিকিৎসা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। রোগীরা আসছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জ্বর কিংবা র্যাশ নিয়ে। ওষুধপত্র কিংবা পরীক্ষার ব্যাপারে হাসপাতালে প্রস্তুতি রয়েছে।"
উপজেলা পর্যায়েও বাড়ছে সংক্রমণ
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে জেলার ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও ২২ জুলাই পর্যন্ত ৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন পাঁচজন।
ডেঙ্গু মোকাবিলার প্রস্তুতি সম্পর্কে সিভিল সার্জন ফয়সল আহমেদ বলেন, "নতুন যোগ দেওয়া চিকিৎসকদের ডেঙ্গু চিকিৎসায় বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। আক্রান্ত হয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের বেশির ভাগ সিটি করপোরেশন এলাকার। এ ছাড়া ময়মনসিংহ মেডিকেলে জেলা ছাড়াও আশপাশের সব জেলার রোগী আসায় সংখ্যাটা বেশি মনে হয়।"
