আফরিন আক্তার ইতি,বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬, ১০:৩৭ পিএম
বুধবার ১৭, জুন ২০২৬ -- : -- --
অভিন্ন নীতিমালাই মানলেন ববি শিক্ষকরা। ছবি: ক্যাম্পাস রিপোর্ট
পদোন্নতির দাবিতে দীর্ঘ আন্দোলন, আমরণ অনশন, ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন এবং প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার মতো কর্মসূচি পালনের পরও শেষ পর্যন্ত কোনো ভিন্ন সমাধান আসেনি বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) শিক্ষকদের জন্য। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) জারিকৃত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিন্ন পদোন্নতি নীতিমালা মেনেই তাঁরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করে ক্লাসে ফিরেছেন। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দুই মাস ধরে চলা বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার অবসান হয়েছে।
গত ১০ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কীর্তনখোলা হলে অনুষ্ঠিত শিক্ষকদের এক সাধারণ সভায় ১২৭ জন শিক্ষকের স্বাক্ষরসংবলিত একটি সম্মতিপত্রের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিন্ন নীতিমালা গ্রহণের সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
পদোন্নতির দাবিতে চলতি বছরের ২২ এপ্রিল থেকে পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেন শিক্ষকরা। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। পরে ২৮ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন উপাচার্যের বিরুদ্ধে ‘সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের’ ঘোষণা দেন আন্দোলনকারী শিক্ষকরা।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১১ মে রেজিস্ট্রার দপ্তর, অর্থ দপ্তর, জনসংযোগ দপ্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তৎকালীন উপাচার্যকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়।
প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতে তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম শিক্ষকদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানালেও তাঁরা সাড়া দেননি। পরে ১৪ মে উপাচার্য নিজে উপস্থিত থেকে প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে দাপ্তরিক কার্যক্রম চালু করেন।
একই দিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওশানোগ্রাফি অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. মামুন অর রশিদকে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁর যোগদানের পর থেকেই শিক্ষকদের আন্দোলনের গতি শিথিল হতে শুরু করে।
আন্দোলনকারী শিক্ষকরা জানান, নতুন উপাচার্য আইন অনুযায়ী সব সমস্যার সমাধান করবেন, এমন আশ্বাসের ভিত্তিতেই তাঁরা আন্দোলন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেন। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সাবেক উপাচার্যও আইনের মধ্য থেকেই পদোন্নতির বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে চেয়েছিলেন, যা সে সময় আন্দোলনকারী শিক্ষকরা গ্রহণ করেননি।
নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ঈদুল আজহার ১৯ দিনের ছুটি শুরু হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস ও পরীক্ষা চালু হতে কিছুটা সময় লাগে। ছুটি শেষে ৭ জুন থেকে ধীরে ধীরে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হতে শুরু করে। পরে ১০ জুনের সভায় শিক্ষকরা লিখিতভাবে অভিন্ন নীতিমালা মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।
এদিকে আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষকদের একটি অংশ ক্ষুব্ধ থাকলেও প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, আন্দোলনের পক্ষে যে স্বাক্ষরের তালিকা উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেটি মূলত কীর্তনখোলা হলে অনুষ্ঠিত একটি সাধারণ মতবিনিময় সভার উপস্থিতি খাতা থেকে নেওয়া হয়েছিল। তাঁদের দাবি, শিক্ষকদের সম্মতি ছাড়াই সেই স্বাক্ষর আন্দোলনের সমর্থন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
অভিন্ন নীতিমালা মেনে ক্লাস ও পরীক্ষায় ফেরার সিদ্ধান্তের বিষয়ে বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. ধীমান কুমার রায় বলেন, "শুরুতে অভিন্ন নীতিমালা সম্পর্কে শিক্ষকদের স্পষ্ট ধারণা না থাকায় অনেকে এটি মেনে নিতে চাননি। তবে বর্তমান প্রশাসন বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ নম্বর ধারা ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এটি মেনে নিয়েছে, আমাদেরও নিতে হতো। তাছাড়া আন্দোলনের কারণে শিক্ষক নিয়োগ আটকে থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি হচ্ছিল। সার্বিক দিক বিবেচনা করেই শিক্ষকরা ক্লাসে ফিরেছেন।"
দীর্ঘ আন্দোলনের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে স্থবিরতা তৈরি হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দেয়। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী অমিও মণ্ডল বলেন, "শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে প্রায় দুই মাস আমরা চরম অনিশ্চয়তায় কাটিয়েছি। আন্দোলন করা তাদের সাংবিধানিক অধিকার, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি একই নীতিমালা মেনেই ক্লাসে ফিরতে হলো, তবে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় কেন নষ্ট করা হলো? আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে যেকোনো সংকটে প্রশাসন ও শিক্ষক সমাজ শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।"
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন অর রশিদ বলেন, "আমি শিক্ষকদের নিজেদের মধ্যে বসে একটি যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলাম এবং তারা বিষয়টি মেনে নিয়েছেন।"
এই অভিন্ন নীতিমালা কবে নাগাদ কার্যকর হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এটি পুরোপুরি আমার হাতে নেই, তবে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী যত দ্রুত সম্ভব নীতিমালাটি কার্যকর করা হবে।"