প্রকাশিত: ১৬ জুন ২০২৬, ০৯:২১ পিএম
একবিংশ শতাব্দীতে তথ্যের প্রবাহ আর কেবল সংবাদমাধ্যমের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে নেই। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট এবং সোশ্যাল মিডিয়ার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এক নতুন তথ্যব্যবস্থার যেখানে একজন সাধারণ নাগরিকই হয়ে উঠতে পারেন প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক। এই নতুন বাস্তবতাই পরিচিত “নাগরিক সাংবাদিকতা” বা Citizen Journalism নামে।
ঐতিহ্যগতভাবে সংবাদ ছিল পেশাদার সাংবাদিক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রিত একটি কাঠামো। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে সেই কাঠামো ভেঙে পড়েছে। আজ কোনো ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তার ছবি, ভিডিও বা লাইভ ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পাদনা ছাড়াই। এই পরিবর্তন কেবল তথ্যের গতি বাড়ায়নি, বরং ক্ষমতার ভারসাম্যকেও জনগণের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এখন আর রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান বা বড় মিডিয়া একমাত্র গেটকিপার নয় বরং প্রতিটি নাগরিকই তথ্য উৎপাদনের সম্ভাব্য কেন্দ্র।
নাগরিক সাংবাদিকতার শক্তির প্রমাণ ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে। ১৯৬৩ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য ধারণ করেছিলেন সাধারণ এক প্রত্যক্ষদর্শী আব্রাহাম জ্যাপ্রুডার। তাঁর ধারণ করা ফুটেজ পরবর্তীতে তদন্ত ও ইতিহাস বিশ্লেষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে ওঠে। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা প্রমাণ করে, সত্য অনেক সময় পেশাদার ক্যামেরার অপেক্ষায় থাকে না বরং সাধারণ মানুষের চোখ ও মোবাইলেই ধরা পড়ে যায়।
ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (টুইটার) কিংবা টিকটক এই প্ল্যাটফর্মগুলো নাগরিক সাংবাদিকতাকে দিয়েছে অভূতপূর্ব গতি ও বিস্তার। একটি ভিডিও এখন কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে পৌঁছে যেতে পারে লাখো মানুষের কাছে।
এই কারণে অনেক সামাজিক আন্দোলন, দুর্নীতি উন্মোচন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বা প্রশাসনিক অনিয়ম প্রথম সামনে এসেছে সাধারণ নাগরিকের ধারণ করা ফুটেজ থেকেই। এমনকি বহু ক্ষেত্রে মূলধারার গণমাধ্যমও পরে সেই কনটেন্টকে ভিত্তি করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
তবে নাগরিক সাংবাদিকতার এই উত্থান যেমন শক্তিশালী, তেমনি জটিলও। তথ্য যাচাই না করেই কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ার ফলে তৈরি হচ্ছে গুজব, বিভ্রান্তি এবং সামাজিক অস্থিরতা। অনেক সময় আংশিক ভিডিও বা বিকৃত তথ্য ভুল ব্যাখ্যার জন্ম দেয়, যা ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এছাড়া প্রাইভেসি লঙ্ঘন, সংবেদনশীল ঘটনার অনৈতিক প্রচার এবং দায়িত্বহীন লাইভ সম্প্রচারও এই নতুন ধারার বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
বাংলাদেশে নাগরিক সাংবাদিকতা দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম মোবাইল ক্যামেরাকে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং সামাজিক প্রতিবাদের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। স্থানীয় দুর্নীতি, নাগরিক ভোগান্তি কিংবা প্রশাসনিক অনিয়ম এমন অনেক ঘটনাই প্রথম সামনে এসেছে ফেসবুক লাইভ বা ইউটিউব ভিডিওর মাধ্যমে।পরবর্তীতে এসব কনটেন্ট জাতীয় গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এভাবে নাগরিক সাংবাদিকতা দেশে একটি বিকল্প তথ্যপ্রবাহের শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠছে।
এমতাবস্থায় ভবিষ্যতের সাংবাদিকতা হবে হাইব্রিড মডেলে, যেখানে পেশাদার সাংবাদিক ও নাগরিক সাংবাদিক একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। তবে এই শক্তিকে কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন ডিজিটাল সাক্ষরতা, তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ।
বর্তমান সময়ে সংবাদ আর কোনো নির্দিষ্ট ভবনের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ থাকছে না। একটি মোবাইল ফোন, একটি ক্যামেরা এবং একজন সচেতন নাগরিক এই তিন উপাদান মিলেই তৈরি করছে নতুন যুগের সাংবাদিকতা। তাই ভবিষ্যতে সমাজের পরিবর্তনে নিরব বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হবে নাগরিক সাংবাদিকতা।
লেখকঃ শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক
