সানজানা শওকত,বুটেক্স প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০২৬, ১০:৩২ পিএম
রবিবার ১৪, জুন ২০২৬ -- : -- --
প্রতীকী ছবি।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) আউটসোর্সিং প্রতিষ্ঠানের অধীনে কর্মরত পাঁচজন কর্মচারীর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে প্রায় এক বছর আগে। তবে এখনো নবায়ন হয়নি সেই চুক্তি। ফলে কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিন ধরে চুক্তি নবায়ন ঝুলে থাকায় অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কর্মীরা। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশ্বাসে নিজস্ব অর্থায়নে বেতন পরিশোধ করায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সামাইরা জবস ব্রিজ লিমিটেডের মাধ্যমে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১৪ জন কর্মী কাজ করছেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, অফিস সহায়তা ও কারিগরি সহায়তাসহ বিভিন্ন সেবামূলক কাজে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। সরাসরি স্থায়ী নিয়োগের পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে জনবল নেওয়ায় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত কর্মী নিয়োগের সুযোগ তৈরি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সামাইরা জবস ব্রিজ লিমিটেডের দুটি পৃথক চুক্তি রয়েছে। এর মধ্যে রেজিস্ট্রার দপ্তরের অধীনে একটি চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে। এ চুক্তির আওতায় নয়জন কর্মী দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে প্রশাসনের সঙ্গে হওয়া আরেকটি চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের জুন মাসে। ওই চুক্তির আওতায় কর্মরত ছিলেন পাঁচজন কর্মী।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্মীদের কাজে বহাল রাখার অনুরোধ জানায় এবং দ্রুত চুক্তি নবায়নের আশ্বাস দেয়। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই কর্মীদের কাজে বহাল রাখা হয়।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুন মাসে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকেই তা নবায়নের জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত নবায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকেই আউটসোর্সিং কর্মী সরবরাহ করে আসা প্রতিষ্ঠানটি কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের ভিত্তিতে নিজস্ব অর্থায়নে কর্মীদের বেতন পরিশোধ অব্যাহত রাখে।
প্রথমে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা আট মাস নিজস্ব তহবিল থেকে কর্মীদের বেতন দেয় প্রতিষ্ঠানটি। পরে চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় নবম মাস থেকে বেতন পরিশোধ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে কর্মীরা বিপাকে পড়েন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বকেয়া বিল পরিশোধ ও চুক্তি নবায়নের আশ্বাস দেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটি আবারও কর্মীদের কথা বিবেচনা করে বেতন দেওয়া শুরু করে। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে কর্মীদের ও তাঁদের পরিবারের আর্থিক সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আরও তিন মাসের বেতন বহন করে প্রতিষ্ঠানটি।
ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মোট ১১ মাসের বেতন নিজস্ব অর্থায়নে পরিশোধ করেছে সামাইরা জবস ব্রিজ লিমিটেড।
চুক্তি নবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদের বারবার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে যেতে হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কক্ষের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার ঘটনাও ঘটেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, প্রথমবার দুই বছরের জন্য চুক্তি নবায়ন করা হলেও পরবর্তী সময়ে কয়েক মাস পরপর স্বল্পমেয়াদি নবায়ন করা হয়েছে। এতে তাদের বাড়তি ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগ থেকেই নবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। একপর্যায়ে উপাচার্যের সম্মতির কথা জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নতুন চুক্তিপত্র দেয়। পরে দ্রুত তাতে স্বাক্ষর করে পরিকল্পনা উন্নয়ন বিভাগের সহকারী পরিচালক হোসাইন মোহাম্মদ আকবরের কাছে জমা দেওয়া হয়।
সে সময় প্রতিষ্ঠানটিকে জানানো হয়েছিল, পরিকল্পনা উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ মো. মামুন কবির এবং অর্থ ও হিসাব বিভাগের পরিচালকের প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন হলেই পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে। তবে চুক্তিপত্র জমা দেওয়ার প্রায় তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো চূড়ান্ত অনুমোদন সম্পন্ন হয়নি। ফলে চুক্তি নবায়ন ও বকেয়া বিল পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বলা হয়, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে চুক্তি নবায়ন হবে এবং বকেয়া বিলও পরিশোধ করা হবে। সেই বিশ্বাসে আমরা কর্মীদের কাজ চালিয়ে যেতে বলেছি। তবে দুঃখের বিষয় প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলও এখনো চুক্তি না বয়ান কিংবা বকেয়া পরিশোধের কোনটিই বাস্তবায়ন হয়নি।”
এদিকে ২০২৫ সালের জুন থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। এতে আউটসোর্সিং কর্মীদের দৈনিক মজুরির সঙ্গে উৎসব ভাতা যুক্ত হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। তবে চুক্তি নবায়ন না হওয়ায় কর্মীরা এখনো সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
বেতন বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন কর্মচারীরা। পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাঁদের।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া কর্মীদের একজন নাজমুল বেপারী বলেন, “আমরা আমাদের বেতন, বৈশাখি ভাতা ও বোনাস পাওয়ার কথা থাকলেও আমরা তা পাচ্ছি না। কোম্পানি নিজেদের তহবিল থেকে কোনোভাবে বেতন পরিশোধ করছে। আমাদের কাজ নিয়ে যদি কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে তা আমাদের জানানো হোক। আর যদি এমন কোনো সমস্যা না থাকে, তাহলে আমরা আশা করি দ্রুত আমাদের চুক্তি নবায়ন করা হবে এবং প্রাপ্য সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা হবে।”
আরেক কর্মী শিল্পী বেগম বলেন, “অন্য জায়গায় সবাই বোনাস পাচ্ছে, কিন্তু আমরা কেন বঞ্চিত হচ্ছি তা বুঝতে পারছি না। আমার স্বামী, মা, সন্তান- সবকিছু নিয়েই আমি খুব কষ্টে আছি। পাঁচ বছর ধরে কাজ করলেও আমরা এখনো ন্যায্য সুবিধা পাচ্ছি না। সবাই পেলে আমরা কেন পাব না। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের কথা শোনার মতো কেউ নেই।”
বিষয়টি নিয়ে বুটেক্সের পরিকল্পনা উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক ড. শেখ মো. মামুন কবির বলেন, “আমরা চুক্তি নবায়ন করতে চাই। ইউজিসির সঙ্গে কথা হয়েছে, বাজেট টিমকেও জানানো হয়েছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রয়োজন। রেজিস্ট্রার অফিসের মাধ্যমে সেই অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। গত বছরের জুন বা জুলাইয়ে এ সংক্রান্ত চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। বর্তমানে আমাদের রেজিস্ট্রার সেকশন ইউজিসি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বিষয়টি অনুসরণ করছে।”
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, পুরো বিষয়টি বর্তমানে সরকারের বাজেট অনুমোদনের ওপর নির্ভর করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না এলে বকেয়া অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। এমনকি আগামী অর্থবছর থেকে ঠিকাদারি খাতে সরকারি বরাদ্দ বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও কিছু করার থাকবে না।