রবিবার ১৪, জুন ২০২৬

রবিবার ১৪, জুন ২০২৬ -- : -- --

মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকাকে স্মরণে পবিপ্রবিতে সেমিনার

মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকাকে স্মরণে পবিপ্রবিতে সেমিনার। ছবি: ক্যাম্পাস রিপোর্ট

মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকাকে স্মরণে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি)।

শনিবার (১৩ জুন) সকাল সাড়ে ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন-১-এর গ্যালারি-২-এ বাংলা একাডেমি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের যৌথ আয়োজনে এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান ও মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মীর হুমায়ুন কবীর, বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীম, সহযোগী অধ্যাপক ড. তানভীর হায়দার, সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল ইসলাম, সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মাদ নূরুন্নবী ও খণ্ডকালীন প্রভাষক আরিফা বিশ্বাস। আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. গিয়াস শামীম, সহকারী অধ্যাপক জোবায়ের আবদুল্লাহ, সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. রুহুল আমীন, বাংলা একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা মামুন সিদ্দিকী, পাবনার বিভিন্ন কবি ও সাহিত্যিক এবং বিভাগের শিক্ষার্থীরা।

সেমিনারের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সেমিনার উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীম। পরে কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকাকে নিয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তানভীর হায়দার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জোবায়ের আবদুল্লাহ।

অনুষ্ঠানে প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. গিয়াস উদ্দিন। এ ছাড়া আলোচনা করেন সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মো. রুহুল আমীন এবং বাংলা একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা মামুন সিদ্দিকী।

স্বাগত বক্তব্যে অধ্যাপক ড. এম আব্দুল আলীম বলেন, “কবি মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা যে শহরে থেকে সাহিত্য সাধনা করেছেন আমি ঠিক সেই শহরেই বাস করি। তিনি যে বাসাটিতে থাকতেন তার পাশেই আমার বাসা। তবে মহাকালের যে বিধান সেই বিধানে মাত্র একশো বছরের যে ইতিহাস পরিক্রমা, সেই পরিক্রমা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার সেই স্মৃতির চিহ্ন, সেই বাড়িটি এখন আর নাই। তার সেই বাড়ি না থাকলেও তার যে কীর্তি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এবং বাংলার সংস্কৃতি জগতে সেটি উজ্জ্বল হয়ে আছে। আমি শুধু বিস্মিত হই যে উনিশশো বিশের দশকে ত্রিশের দশকে পাবনা শহর থেকে একজন নারী কলকাতার আলবার্ট হলে গিয়ে সেখানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেছেন। বনমালী ইনস্টিটিউট, শিপলাই জমিদার বাড়ি, অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরি, পাবনা টাউন হল এই সমস্ত জায়গায় তখন যে সমস্ত সাহিত্য আসর এবং সাহিত্য সম্মেলন হয়েছে সেখানে অনেক সভায় মধ্যমণি হয়ে এই মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা আসন গ্রহণ করেছেন। উনিশশো পঁচিশ সালে পাবনা শহরে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। মহাত্মা গান্ধীর সেই সভায় একমাত্র মুসলিম নারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এই মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা। ফলে রাজনীতির জগৎ, সাহিত্য সংস্কৃতির জগৎ সব জায়গায় এই মহীয়সী নারীর সরব উপস্থিতি ছিল। আমি চাই যে, আমাদের ছেলেমেয়েরা এই মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার দেখানো যে আলোর শিখা, সেটা তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছড়িয়ে দিবে এবং এই আয়োজন করায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি ও বিভাগের সবাইকে বিশেষভাবে অভিবাদন জানাই।”

সেমিনারের সভাপতি ও বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মীর হুমায়ুন কবির বলেন, “আজকে বাংলা বিভাগে বাংলা একাডেমির এই আয়োজন সত্যিই বাংলা বিভাগের জন্য একটা গৌরবের বিষয়। একই সঙ্গে বাংলা একাডেমির যে কর্মকর্তা প্রতি মুহূর্তে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন তিনি বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক ইমরুল ইউসুফ। আমি তাকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। বাংলা একাডেমি ইতিমধ্যে আমাদের জানিয়েছেন, আজকে যে দুটি প্রবন্ধ যেটা এখানে পঠিত হয়েছে তারা সেই প্রবন্ধ আমাদের কাছ থেকে নেবেন এবং সম্ভবত বাংলা একাডেমি যে স্মারক গ্রন্থ করবে আমাদের দুজন প্রাবন্ধিকের যে দুটি লেখা সেখানে হয়তোবা স্থান পাবে। অর্থাৎ এই জায়গাটিতে বলা যায় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় একটা ঐতিহাসিক জায়গা তৈরি করতে পারলেন। এই অনুষ্ঠানের পুরো যে সৌন্দর্য সেই সৌন্দর্যটা আরও বর্ধন করেছে এই অনুষ্ঠানের পুরো অলংকার আমার শিক্ষার্থীরা এবং সবচেয়ে বড় বিষয় পাবনা জেলার সুধী সমাজ। পাবনা জেলার সুধীমহল এখানে আছেন। তারা বিভিন্ন পর্যায়ে খুবই প্রতিষ্ঠিত এবং গুরুত্বপূর্ণ।”

প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম বলেন, “কোনো জাতির অগ্রযাত্রা কেবল রাজনৈতিক ইতিহাসের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না। সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং জ্ঞানচর্চাও সেই যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। একজন সাহিত্যিক তার সময়কে ধারণ করেন, সমাজের মনস্তত্ত্বকে প্রকাশ করেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা ছিলেন তেমনই একজন সাহিত্যিক, যিনি তাঁর সময়কে অতিক্রম করে আজও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ ছিল পরিবর্তনের যুগ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, নারীশিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক সংস্কারের নানা ধারা তখন সমাজকে নতুনভাবে রূপান্তরিত করছিল। কিন্তু সেই সময় মুসলিম নারীদের সাহিত্যচর্চা ছিল অত্যন্ত সীমিত। সামাজিক রক্ষণশীলতা, শিক্ষার অপ্রতুলতা এবং পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা তাদের পথকে কঠিন করে তুলেছিল। এই প্রতিকূল বাস্তবতায় মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা কলম হাতে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি শুধু সাহিত্য রচনা করেননি। তিনি একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিলেন। তার জীবন আমাদের শেখায় যে জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার শক্তি সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করতে পারে। তিনি বাংলা সাহিত্যে মুসলিম নারী লেখকদের অগ্রপথিকদের অন্যতম। তার কবিতায় মানবতা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা, সৌন্দর্যবোধ এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়। তার সাহিত্যকর্ম আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সাহিত্য কেবল আবেগের প্রকাশ নয়। এটি সমাজকে দেখার এবং সমাজকে বদলে দেওয়ার একটি শক্তিশালী মাধ্যম।”

সেমিনারে বক্তারা বাংলা সাহিত্যে মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকার অবদান, তাঁর সাহিত্যচর্চা, সমকালীন সমাজে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর জীবন ও কর্ম তুলে ধরার গুরুত্বের ওপর আলোকপাত করেন।

Link copied!