চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মাহিদুল ইসলাম ফরহাদ
প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫৬ পিএম
শনিবার ২৯, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --
সালাউদ্দিন
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় এক মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে ১২ বছরের এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ওই শিক্ষক ও তাঁর লোকজনের হুমকির কারণে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তাঁর পরিবার এলাকা ছেড়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছে পরিবারটি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর বয়স যখন ছয় বছর, তখন তাঁর বাবা-মা বাড়ির কাছের একটি নূরানি মাদ্রাসায় তাঁকে ভর্তি করেন। এরপর থেকে একই মাদ্রাসার শিক্ষক শিবনগর গ্রামের আব্দুল হাকিমের ছেলে সালাউদ্দিন (৩৫) ওই শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়ে নিয়মিত প্রাইভেট পড়াতেন।
পরিবারের দাবি, গত ২ জুন সকাল ৯টার দিকে প্রতিদিনের মতো ওই শিক্ষার্থী নিজ বাড়ি থেকে মাদ্রাসার উদ্দেশে রওনা হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর সালাউদ্দিন তার সামনে এসে উপস্থিত হন। পরে কৌশলে ওই শিক্ষার্থীকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ পরিবারের।
মাদ্রাসা ছুটির দুই ঘণ্টা পরও শিক্ষার্থী বাড়িতে না ফেরায় তাঁর বাবা-মা মাদ্রাসায় গিয়ে খোঁজ নেন। সেখানে তাঁদের জানানো হয়, ওই শিক্ষার্থী সেদিন মাদ্রাসায় যায়নি। পরে তাঁরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে স্থানীয়দের মাধ্যমে তাঁরা জানতে পারেন, সালাউদ্দিন ওই শিক্ষার্থীকে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গেছেন।
এরপর শিক্ষার্থীর বাবা-মা সালাউদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে মেয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোনো সদুত্তর না দিয়ে তাঁদের হুমকি দিয়ে তাড়িয়ে দেন বলে অভিযোগ। পরে কয়েক দফায় তাঁরা সালাউদ্দিনের বাড়িতে গেলেও প্রতিবারই তাঁদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও হুমকি দেওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি।
পরিবারের ভাষ্য, সামাজিক সম্মানের কথা বিবেচনা করে তাঁরা প্রথম দিকে বিষয়টি কাউকে জানাননি। এভাবে প্রায় এক সপ্তাহ কেটে যাওয়ার পর কোনো উপায় না পেয়ে তাঁরা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানান। স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তিন-চার দিন চেষ্টা করেও ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হন। পরে তাঁদের পরামর্শে শিক্ষার্থীর বাবা-মা গত ১৪ জুন শিবগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগের পরদিন এএসআই শাহজাহান মিয়ার নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল সালাউদ্দিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ওই শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে। পরে তাঁকে মোবারকপুর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বাবুল আলীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে ইউপি সদস্য শিক্ষার্থীকে তাঁর বাবা-মায়ের কাছে বুঝিয়ে দেন।
পরিবারের অভিযোগ, এর পরদিন সালাউদ্দিন ২০-৩০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে আবারও তুলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় শিক্ষার্থীর বাবা বাড়িতে না থাকায় তাঁর মা ও নানি বাধা দেন। বাধা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীর নানি আহত হন বলে পরিবারের দাবি।
তাঁদের চিৎকার শুনে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এলে সালাউদ্দিন ও তাঁর সঙ্গে থাকা লোকজন ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওই শিক্ষার্থীকে আবার তুলে নিয়ে যাওয়ার এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চলে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এরপর প্রাণভয়ে শিক্ষার্থীর মা ও নানি তাঁকে নিয়ে রাতের আঁধারে এলাকা ছেড়ে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে মুঠোফোনে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিষয়টি জানানো হয়। তাঁদের পরামর্শে পুনরায় থানায় যাওয়ার চেষ্টা করলেও সালাউদ্দিন ও তাঁর লোকজন বিভিন্ন স্থানে তাঁদের খোঁজাখুঁজি করছিলেন এবং থানার আশপাশে অবস্থান করছিলেন বলে দাবি করেন শিক্ষার্থীর মা। নিরাপত্তাহীনতার কারণে তাঁরা তখন থানায় যেতে পারেননি।
পরিবারের দাবি, প্রায় এক সপ্তাহ পর গত ৩০ জুন শিক্ষার্থীর মা, নানি ও তাঁদের এক আত্মীয় শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে বিষয়টি জানান। পরে তাঁদের থানায় গিয়ে মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এরপর তাঁরা শিবগঞ্জ থানায় গিয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) সঙ্গে দেখা করে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করতে চান। তবে তাঁদের মামলা না নিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
এর দুই দিন পর শিবগঞ্জ থানার এএসআই স্বপন কুমার সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ওই শিক্ষার্থীর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে খোঁজ করেন। এ সময় শিক্ষার্থীর মা মেয়েকে খোঁজার কারণ জানতে চাইলে এএসআই স্বপন কুমার জানান, সালাউদ্দিন তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। পরে বাড়িতে শিক্ষার্থীকে না পেয়ে তিন দিনের মধ্যে তাঁকে হাজির করার জন্য পরিবারকে সময়সীমা দেওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি।
পরবর্তীতে কোনো উপায় না পেয়ে গত ৬ জুলাই শিক্ষার্থীর পরিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালতে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করে। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে নিকটস্থ থানায় মামলা না নেওয়ার কারণ জানতে চেয়ে শিবগঞ্জ থানার ওসিকে আগামী ২০ জুলাইয়ের মধ্যে লিখিত জবাব দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এ বিষয়ে সালাউদ্দিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।