মৌলভীবাজার থেকে রাজন হোসেন তৌফিক
প্রকাশিত: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ০১:৫১ পিএম
শনিবার ২৯, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --
ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট
মৌলভীবাজারের সব উপজেলার ইউনিয়ন ভূমি অফিসের চিত্র এখন এমনই। গ্রামের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ খাজনা, নামজারি বা মিস কেস করাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত ঘুষ-বাণিজ্যের শিকার হচ্ছেন।
রাজনগরের নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান কামরুল ইসলাম। বাপ-দাদার ২৫ শতক জমির মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে তিনি ২ শতক জমির মালিক। এই ২ শতক জমি বিক্রির জন্য খাজনা পরিশোধ করতে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে যান তিনি।
ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা তাকে বলেন, বিগত ৫০ বছর খাজনা দেওয়া হয়নি। খাজনা এসেছে ১৪ হাজার টাকা। অনেক অনুরোধের পর ৯ হাজার টাকায় খাজনা কেটে দেন ওই কর্মকর্তা।
একই অবস্থা লিপন আহমেদের। বাবার নামে ৬৯ শতক জমির পরচায় তার অংশ ৯ শতক। ৫০ হাজার টাকা ব্যাংকঋণের জন্য খাজনার রসিদ দরকার। অফিসে গেলে বলা হয় পুরো ৬৯ শতকের খাজনা দিতে হবে। কম্পিউটারে দেখিয়ে ২২ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে কিছু টাকা ঘুষ দেওয়ার পর ১৪ হাজার ৮১৮ টাকার খাজনা কেটে দেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ অনলাইনে খাজনা দিতে পারেন না। ইউনিয়ন ভূমি অফিসে গেলেই প্রথমে বলা হয় ৫০ বছরের খাজনা বকেয়া। একপর্যায়ে সেবাগ্রহীতা ঘুষ দিতে বাধ্য হন। ঘুষ দেওয়ার পর হয় জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে দেওয়া হয়, নয়তো ৫০ বছরের জায়গায় ৫ বছরের খাজনা বসিয়ে দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, এম এ ইসলাম নামের একজনের ১৯ হাজার টাকা খাজনা দেখিয়ে ৯ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে। পরে অনলাইনে মাত্র ৫ হাজার টাকার রসিদ কেটে দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাব-রেজিস্ট্রার বলেন, আমার এক স্যারের অনলাইনে সাড়ে ৪ হাজার টাকা খাজনা দেখিয়েছিল। অফিসে কথা বলার পর ভুল বলে ৪০ টাকায় ঠিক করে দেওয়া হয়।
সরকার নামজারির ফি নির্ধারণ করেছে মাত্র ১ হাজার ১০০ টাকা। কিন্তু ইউনিয়ন ভূমি অফিসে টাকা না দিলে ফাইল ছাড়ে না। নামজারি ও মিস কেসের জন্য ৫ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা চুক্তি হয়। জটিল সমস্যা থাকলে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষের চুক্তি হয়।
অভিযোগ আছে, ঘুষ লেনদেনের সঙ্গে তহশিলদার, অফিস সহকারী, কানুনগো, সার্ভেয়ার, জারিকারক, পিয়ন এমনকি দালরাও জড়িত। ঘুষ না দিলে এক দিনের কাজ পাঁচ-ছয় দিন ঘুরানো হয়। এমনকি তথ্য জানতে পিয়নকে ১০০-২০০ টাকা দিতে হয়।
ভুক্তভোগীরা বলেন, কৃষকরা ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিতে গেলেও খাজনার জন্য বিপদে পড়েন। অথচ সরকার ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমির খাজনা মওকুফ করেছে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোসা. শাহীনা আক্তার বলেন, ভূমি অফিসে অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণসহ অভিযোগ পেলে সঙ্গে ওই কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হবে। অনেকেই মৌখিকভাবে শ্রেণি পরিবর্তন করে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ করেছেন, তবে লিখিত অভিযোগ কেউ করেননি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ এস এম সালেহ আহমেদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, এসব বিষয়ে মন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ দিতে হবে। তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।