বৃহস্পতিবার ১৩, আগস্ট ২০২৬

বৃহস্পতিবার ১৩, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

২৪ বছর ধরে হলের ধুলোমাখা করিডোরের এক নীরব সেবক

..

প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৬ এএম

শ্রী নারায়ণ দাস

মাহিদুল ইসলাম

কারো জুতার তলা ক্ষয়ে গেছে, কারো স্যান্ডেলের ফিতা ছিঁড়ে গেছে, আবার কারো জুতোর আঠা উঠে গেছে। এমন মুহূর্তে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর শিক্ষার্থীদের প্রথম ভরসা একজনই; ধুলোমাখা করিডোরে চুপচাপ বসে থাকা সেই বৃদ্ধ মানুষটি শ্রী নারায়ণ দাস। তার হাতে পড়লেই যেন নতুন জীবন ফিরে পায় জীর্ণ হয়ে যাওয়া  জুতােজোড়া ।

শ্রী নারায়ণ দাসের বয়স এখন ৬৪ বছর। ২০০২ সাল থেকে, অর্থাৎ টানা প্রায় ২৪ বছর ধরে তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে বসে শিক্ষার্থীদের জুতা-স্যান্ডেল সেলাই করে আসছেন। এই দীর্ঘ সময় ধরে তার কাজ শুধু পেশাগত সেবার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ছাত্রদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে এক গভীর আস্থা ও ভালোবাসার সম্পর্ক।

প্রতিদিন সকাল দশটার দিকে মোহাম্মদ নগরের নিজের বাসা থেকে হেঁটেই রওনা দেন ক্যাম্পাসের পথে। কখনো খান জাহান আলী হল, কখনো খানবাহাদুর আহসানুল্লাহ হল, আবার কখনো মেয়েদের হলঅপরাজিতা কিংবা বিজয় ২৪ এর সামনে বসে পড়েন। জরুরি প্রয়োজনে ফোন পেলেই ছুটে যান এক হল থেকে আরেক হলে। কখনো কখনো নিজ হাতে জুতা পালিশ করে শিক্ষার্থীদের রুমে পৌঁছে দিতেও দ্বিধা করেন না। তার এই উদারতা ও দায়িত্ববোধ ছাত্রদের মনে গেঁথে গেছে।

অনেক সময় তাড়াহুড়োর কারণে কেউ কাজের টাকা দিতে পারে না। কিন্তু এতে নারায়ণ দাসের মন খারাপ হয় না। তিনি বলেন,“ছাত্ররা পড়ে এসে টাকা দিয়ে যায়।”
এই সম্পর্কের মধ্যে কোনো হিসাবের খাতা নেই, নেই কোনো মনোমালিন্য। তিনি নিজেকে ছাত্রদের কাছের একজন মনে করেন। জুতা-স্যান্ডেল সেলাই করেই কেটেছে তার জীবনের দীর্ঘ সময়। হাতের কাজ করেই কোনোরকমে সংসার চালান। তার সংসারে রয়েছে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। স্ত্রীও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। নিজেরও ডায়াবেটিস রয়েছে; নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়।

বার্ধক্যের কারণে বহুবার কাজ ছেড়ে দেওয়ার কথা ভেবেছেন তিনি। কিন্তু ছাত্রদের বিশ্বাস ও ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন করতে পারেননি। সিএসই ডিসিপ্লিনের ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী সৌরভ বলেন,“ব্যস্ততার কারণে একবার জুতা আনতে ভুলে গিয়েছিলাম। তিনি নিজ দায়িত্বে আমার রুমে জুতা পৌঁছে দেন।”

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য মূলত হাঁটাচলাকেই বেছে নিয়েছেন নারায়ণ দাস। শরীরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও কেউ ডাকলেই হাজির হন। কারো টাকা দিতে সমস্যা হলে কম পারিশ্রমিকেই কাজ করে দেন।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর করিডোরে বসেই কেটে গেছে তার জীবনের বড় একটি অধ্যায়। একজন মুচির প্রতি ছাত্রদের ভালোবাসা ফুটিয়ে তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মানবিক দিক। নারায়ণ দাসের গল্প শুধু একজন বৃদ্ধ মুচির গল্প নয় এটি সেবা, আস্থা ও মানবিকতার গল্প। তার মতো শ্রমজীবী মানুষেরাই  প্রমাণ করেন, ক্যাম্পাসের পরিচয় শুধু ক্লাসরুমে নয় শ্রম, আস্থা আর নিঃস্বার্থ সেবাতেও গড়ে ওঠে।

Link copied!