মৌলভীবাজার থেকে রাজন হোসেন তৌফিক
প্রকাশিত: ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০১ পিএম
মঙ্গলবার ০৪, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --
সংগৃহীত ছবি
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার ৮ নম্বর মনসুরনগর ইউনিয়নের মালিকোনা গ্রামের একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘরে চলছে টিকে থাকার লড়াই। রাত ১০টার দিকে হারিকেনের ম্লান আলোয় মেঝেতে পাটি পেতে ঘুমানোর চেষ্টা করছে চার এতিম শিশু। বড় বোন ১০ বছরের রিয়া ছোট বোন রিতাকে ঘুম পাড়াচ্ছে, আর পাশে ৮ বছরের রিয়াদ ও ২ বছরের জিহাদ ক্ষুধার কষ্ট নিয়ে শুয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পর ভাড়ার অটো রিকশা চালিয়ে বাড়ি ফেরেন ৩৩ বছর বয়সী আলেদ মিয়া। সারাদিনের উপার্জন থেকে হাতে থাকা মাত্র ৩০০ টাকা বৃদ্ধা মা বানু বেগমের হাতে তুলে দিয়ে তিনি সংসারের হিসাব মেলানোর চেষ্টা করেন। সীমিত এই আয়েই চলছে ৯ সদস্যের পুরো পরিবারের জীবনযুদ্ধ।
পরিবারটির দুর্ভাগ্যের শুরু ২০২৩ সালে, যখন মারা যান চার শিশুর মা হেপু বেগম। একই বছরের শেষ দিকে নিখোঁজ হন বাবা জনর মিয়া। তিনি জীবিত নাকি মৃত, তা আজও নিশ্চিত নয়। এরপর ২০২৫ সালে মারা যান পরিবারের শেষ অবলম্বন নানা মাহন মিয়া। একের পর এক স্বজন হারিয়ে চার শিশুর দায়িত্ব এসে পড়ে মামা আলেদ মিয়ার কাঁধে।
বর্তমানে ১০ বছরের রিয়া, ৮ বছরের রিয়াদ, ৫ বছরের রিতা ও ২ বছরের জিহাদ, তাদের বৃদ্ধা নানি এবং আলেদ মিয়ার নিজের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মোট ৯ জনের সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনের উৎস অন্যের কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া একটি অটো রিকশা। মালিকের ভাড়া ও গ্যাসের খরচ পরিশোধের পর প্রতিদিন তার হাতে থাকে প্রায় ৩০০ টাকা।
পরিবারটির অসহায় অবস্থার কথা জানিয়ে পাশের বাড়ির এক বিধবা নারীও এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, "আমি নিজে অসহায়। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভিক্ষা করে চাল-ডাল আনি। সেইখান থেকে এক মুঠো ভাত এই এতিম ৪টা বাচ্চার মুখে তুলে দেই। আমারও পেটে ভাত নাই। তবুও বাচ্চাগুলার ক্ষুধার্ত মুখ দেখলে কলিজা ফেটে যায়। আল্লাহর দোহাই, কেউ একটু সাহায্য করেন। নইলে এই বাচ্চাগুলা না খেয়ে মারা যাবে।"
পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেওয়া আলেদ মিয়া নিজের সীমাবদ্ধতার কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, "সকাল ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত অটো চালাই। মালিককে ভাড়া ও গ্যাসের খরচ দিয়ে হাতে থাকে ৩০০ টাকা। এই টাকা দিয়ে ৯ জনের খাবার, ওষুধ, ঘর ভাড়া সব চালাতে হয়। আমি মামা হয়েও বাপের দায়িত্ব পালন করতে পারি না।"
বৃদ্ধা নানি বানু বেগমও নাতি-নাতনিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, "মেয়ে-জামাই হারাইছি। স্বামীটাও গেল। এখন এই নাতি-নাতনিগুলারে না খাওয়াইয়া মরতে পারবো না। কিন্তু পারিও না।"
অভাবের কারণে বড় মেয়ে রিয়া ক্লাস ফাইভে পড়লেও এখন আর স্কুলে যেতে পারছে না। ছোট ভাই-বোনদের দেখাশোনার দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়েছে।
রিয়া বলে, "স্কুলে গেলে ছোটরা না খেয়ে থাকবো।"
পরিবারের অন্য শিশুদের অবস্থাও করুণ। রিয়াদের গায়ে একটি পুরনো জামা, রিতার পায়ে নেই জুতা, আর জ্বরে আক্রান্ত ছোট জিহাদকে অর্থাভাবে চিকিৎসকের কাছেও নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
পরিবারটির দাবি, নিয়মিত খাদ্য সহায়তা, নগদ আর্থিক সহযোগিতা, চার শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে বই-খাতা ও স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা, মামা আলেদ মিয়ার জন্য একটি নিজস্ব অটো রিকশা এবং এতিম ও বয়স্ক ভাতার আওতায় অন্তর্ভুক্তি। তাদের মতে, নিজস্ব অটো রিকশা পেলে দৈনিক আয় প্রায় ৮০০ টাকায় উন্নীত হতে পারে, যা পরিবারটির জীবনমান বদলে দিতে পারে।
আলেদ মিয়া বলেন, "আমি ভিক্ষা চাই না। শুধু কাজ করার সুযোগ চাই। আমার ভাগ্নেগুলা যেন মানুষের মতো মানুষ হয়।"
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং সমাজের বিত্তবানদের প্রতি পরিবারটির আবেদন, দ্রুত তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হোক। চার এতিম শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে মানবিক উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।