বৃহস্পতিবার ১৮, জুন ২০২৬

বৃহস্পতিবার ১৮, জুন ২০২৬ -- : -- --

খুবি অধ্যাপকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্পিতা

প্রকাশিত: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৪৪ পিএম

অভিযুক্ত অধ্যাপক রেজাউল ইসলাম। ছবি: ক্যাম্পাস রিপোর্ট

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রধান অধ্যাপক রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের সঙ্গে অশালীন আচরণ, যৌন হয়রানি এবং অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ পাওয়ার পর তাঁকে ডিসিপ্লিন প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই সঙ্গে অভিযোগ তদন্তে কাজ শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্র।

বুধবার (১৭ জুন) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি অভিযোগটি তদন্তের কাজ শুরু করে। নিরোধ কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক মোছা. তাসলিমা খাতুন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে মঙ্গলবার (১৬ জুন) দুপুরে এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীরা এক ভুক্তভোগী ছাত্রীর পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাঠানো বিভিন্ন বার্তার স্ক্রিনশট ও অন্যান্য প্রমাণপত্রসহ যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রে লিখিত অভিযোগ দেন।

অভিযোগে ভুক্তভোগী ছাত্রী উল্লেখ করেন, শুরুতে ওই শিক্ষক তাঁর সঙ্গে ভালো আচরণ করলেও পরে মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপে নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ ও অস্বস্তিকর বার্তা পাঠাতে শুরু করেন। অভিযোগের সঙ্গে জমা দেওয়া নথিপত্রে দেখা যায়, তিনি ছাত্রীকে উদ্দেশ করে লিখেছেন, “তোমার মতো মেয়ে বিয়ের আগে পাওয়া দরকার ছিল”, “আই লাভ ইউ মোর দ্যান আই ক্যান সে”, “লাভ ইন ইংলিশ দ্যা জান্নাহ”, “আমি তোমাকে ছাড়া থাকতে পারব না”, “তাহলে আজ থেকে ভালোবাসা শুরু হোক”, “বন্ধুর সাথে হাগ করলে সব ডিপ্রেশন থাকেনা”, “তোমার মতো সুন্দরী মেয়ে দুনিয়ায় কম আছে”, “ডিসিপ্লিনে আমি শুধু মারি, আদর করে মারি কোনো মেয়েদের মারিনা কিন্তু তোমাকে মারতে হবে”।

প্রতিবেদকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগে ভুক্তভোগী ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “আমি ফেসবুকে তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর পরদিনই তিনি তা গ্রহণ করেন এবং সঙ্গে সঙ্গে বার্তা পাঠানো শুরু করেন। বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করেছিল। পরবর্তীতে তার পাঠানো বার্তাগুলো ক্রমেই অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে আমি বিষয়টি আর সহ্য করতে না পেরে সহপাঠী ও ডিসিপ্লিনের প্রতিনিধিদের জানাই। প্রথমদিকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না দেখলেও, পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।”

তিনি আরও বলেন, “একজন শিক্ষকের কাছ থেকে এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। শুরুতে প্রভাবশালী এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পেলেও, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা প্রয়োজন মনে করেই আমি সামনে এসেছি। আমি চাই অন্য ভুক্তভোগীরাও সাহস করে কথা বলুক এবং এ ঘটনার এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক বিচার হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো শিক্ষার্থীকে এই পরিস্থিতির শিকার হতে না হয়।”

একই ডিসিপ্লিনের আরেক ছাত্রী অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে অতীতে মৌখিক ও মানসিক হেনস্তার অভিযোগ তুলে বলেন, প্রায় এক যুগ আগে যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এতটা জনপ্রিয় ছিল না, তখনও ক্লাসের সবার সামনে কিংবা গভীর রাতে ফোন ও মেসেজে ছাত্রীদের, বিশেষ করে বিবাহিত ছাত্রীদের, নানা ধরনের আপত্তিকর ও অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতেন ওই শিক্ষক।

এদিকে ঘটনা সামনে আসার পর এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের বিভিন্ন ব্যাচের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন আরও দুজন ভুক্তভোগী ছাত্রী। তাঁদের অভিযোগসংক্রান্ত প্রমাণপত্রও প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, শিক্ষকের ব্যক্তিগত চাওয়া বা প্রস্তাবে সাড়া না দিলে তাঁরা বিভিন্নভাবে তাঁর ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হতেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অধ্যাপক মো. রেজাউল ইসলাম। তাঁর দাবি, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গত ফেব্রুয়ারিতে আমার মোবাইল ফোনটি চুরি হয়ে যায়। এরপর থেকে আমি আমার ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দিয়েছি। এই বিষয়ে থানায় জিডি করা হলেও এখনো ফোনটি উদ্ধার হয়নি। ডিসিপ্লিনের প্রধান হিসেবে আমি অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করেছি এবং শিক্ষার্থীদের কিছু নিয়মের বাইরে যেতে বাধা দিয়েছি। মূলত ঈর্ষা ও শত্রুতা থেকেই আমার বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার চালাচ্ছে একটি মহল।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের সভাপতি অধ্যাপক মোছা. তাসলিমা খাতুন অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ তদন্তে জরুরি সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পরবর্তী আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হারুনর রশিদ খাঁন বলেন, ডিনদের সঙ্গে বৈঠক করে অভিযুক্ত শিক্ষককে ডিসিপ্লিন প্রধানের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। তাঁর স্থলে ড. মো. ইয়াসিনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার পর বাকি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

Link copied!