প্রকাশিত: ০৭ জুন ২০২৬, ০৮:৫৬ এএম
বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ জাপান দীর্ঘদিন ধরেই জনসংখ্যা সংকটের মুখোমুখি। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে জন্মহার আরও কমে নতুন রেকর্ড গড়েছে। গত বৃহস্পতিবার জাপানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৫ সালে জন্ম নেওয়া শিশুর সংখ্যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
এর আগে ২৯ মে প্রকাশিত ২০২৫ সালের আদমশুমারির প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, জাপানের মোট জনসংখ্যা বর্তমানে ১২ কোটি ৩০ লাখ ৪৯ হাজার ৫২৪ জন। ২০২০ সালের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ৩১ লাখ কম, যা ২ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাসের সমান। দেশটির ইতিহাসে এত দ্রুত জনসংখ্যা কমার ঘটনা আগে দেখা যায়নি।
জনসংখ্যা কমে যাওয়ার ফলে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশগুলোর তালিকায় জাপান এখন ১২তম অবস্থানে রয়েছে। তবে বিদেশি বাসিন্দার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৩২ লাখ ১০ হাজারে পৌঁছেছে। জাপানের ৪৭টি প্রশাসনিক অঞ্চলের মধ্যে শুধু টোকিও ও ওকিনাওয়ায় জনসংখ্যা বেড়েছে; বাকি ৪৫টি অঞ্চলে কমেছে।
জাপানে কয়েক বছর ধরেই মৃত্যুর সংখ্যা জন্মের তুলনায় বেশি। ২০২৫ সালে দেশটিতে মোট ৬ লাখ ৭১ হাজার ২৩৬টি শিশুর জন্ম হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার কম। ১৮৯৯ সালে জন্মসংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর এটি সবচেয়ে কম জন্মসংখ্যা। একই সময়ে একজন নারীর গড় সন্তান জন্মদানের হার নেমে এসেছে ১ দশমিক ১৪-এ। অথচ জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে সাধারণত এই হার ২ দশমিক ১ হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, অনিশ্চিত চাকরির বাজার, উচ্চশিক্ষার খরচ এবং শহরাঞ্চলে আবাসনের উচ্চমূল্য তরুণদের বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। এছাড়া কর্মক্ষেত্র ও পারিবারিক দায়িত্ব বণ্টনে বিদ্যমান বৈষম্যের কারণে সন্তান লালন-পালনের বড় অংশ এখনও নারীদের ওপর নির্ভরশীল, যা জন্মহার কমার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতি ও সমাজে প্রভাব
জন্মহার কমে যাওয়ায় জাপান দ্রুত প্রবীণ জনগোষ্ঠীনির্ভর সমাজে রূপ নিচ্ছে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশই প্রবীণ। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৭০ সালের মধ্যে এ হার ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধির কারণে দেশটিতে গড় আয়ু প্রায় ৮৫ বছরে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে শতবর্ষী মানুষের সংখ্যাও প্রায় এক লাখের কাছাকাছি। ফলে বয়স্ক নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা, পরিচর্যা ও পেনশন খাতে সরকারের ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে।
অন্যদিকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাওয়ায় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তরুণদের বড় শহরমুখী হওয়ার প্রবণতায় স্থানীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়েছে।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের উদ্যোগ
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি জনসংখ্যা হ্রাসকে একটি “নীরব জরুরি অবস্থা” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি তরুণদের আয় বৃদ্ধি এবং একক অভিভাবকদের জন্য আর্থিক সহায়তা সম্প্রসারণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সরকার ইতোমধ্যে শিশু ভাতা বৃদ্ধি, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি গ্রহণে উৎসাহ এবং পরিবারবান্ধব নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি শ্রমশক্তির ঘাটতি পূরণে শিল্প ও সেবা খাতে রোবট, অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় রাখার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
এছাড়া নির্মাণ, পরিবহন ও সেবাখাতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও জনসংখ্যা হ্রাসের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। ফলে বর্তমান নীতিগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে জনমহলে আলোচনা ও পুনর্মূল্যায়নের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।
