সোমবার ০৮, জুন ২০২৬

সোমবার ০৮, জুন ২০২৬ -- : -- --

৯ মাসেও এগোয়নি বিচার,অপেক্ষায় কুবি শিক্ষার্থীর পরিবার

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৭ জুন ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম

সংগৃহীত ছবি

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) লোক প্রশাসন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিন রিনথী ও তার মা তাহমিনা বেগম হত্যাকাণ্ডের নয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো শুরু হয়নি বিচারিক কার্যক্রম। বহুল আলোচিত এ জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিলেও তদন্ত প্রতিবেদন (চার্জশিট) দাখিলে বিলম্বের কারণে মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে অগ্রসর হতে পারেনি।

মামলার তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা নগরীর কালিয়াজুড়ি এলাকার একটি ভাড়া বাসা থেকে সুমাইয়া আফরিন ও তার মা তাহমিনা বেগমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিন অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত মোবারক হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার ১ নম্বর আমলি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করেন। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

দেশজুড়ে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের বিচারিক অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবারের সদস্য এবং সহপাঠীরা। তাদের অভিযোগ, স্বীকারোক্তি ও বিভিন্ন আলামত থাকার পরও মামলার তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে।

সুমাইয়া আফরিনের সহপাঠী মেহেদী হাসান শাহিন বলেন, "তৎকালীন পুলিশ, প্রশাসন, ইন্টেরিম সরকারকে বাঁচানোর জন্য এই ঘটনাটাকে ধামাচাপা দিয়েছিল। ভাইরাল হয়নি আমরা বিচারও পাইনি। বাংলাদেশে তো ভাইরাল না হলে আবার বিচার পাওয়া যায় না। বর্তমান সরকারের কাছে আমার আবেদন থাকবে যেন এই নৃশংসতার বিচার আমরা পাই। ধর্ষক যেন পার না পেয়ে যায়। এর ব্যতিক্রম হলে আমরা সারাদেশ আন্দোলনের ডাক দিব।"

আরেক সহপাঠী সামিউন ঔশি বলে, "রামিসা হত্যাকাণ্ডের রায়ে দেশ স্বস্তি পেলেও আলোচনার বাইরে থাকা অসংখ্য মামলার বিচার এখনো অনিশ্চিত। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিন ও তার মায়ের জোড়া হত্যাকাণ্ডের ২৭২ দিন পেরিয়ে গেলেও মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। স্বীকারোক্তি ও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিচার বিলম্বিত। আমরা চাই, সুমাইয়া ও তার মায়ের হত্যাকারীরও দ্রুত সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হোক।"

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমরুল হাসান রাহাত বলেন, "কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেরুদণ্ডহীন। আমাদের একজন বোনকে এভাবে হত্যা করা হলো এত মাস পর সবে স্বীকারোক্তি। আমাদের উচিত ছিলো এর মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য সচেষ্ট হওয়া।"

নিহত সুমাইয়ার বড় ভাই মো. সাইফুল বলেন, “এটা ওনাদেরও একটু গাফিলতি থাকতে পারে। গাফিলতি না থাকলে তো এত দেরি হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিচার প্রক্রিয়া হচ্ছে সরকারি মহল থেকে যত চাপ দেওয়া হবে, তত দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। সবার জন্য সমান সুবিধা থাকে না, আমার দৃষ্টিকোণ থেকে তাই মনে হয়।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, যত দ্রুত সম্ভব বিচার কার্যক্রম শুরু করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আর কোনো বিলম্ব না করে মামলার বিচার সম্পন্ন করা।”

মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিহত পরিবারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সোহেল হোসাইন বলেন, “মামলাটির ধার্য তারিখ রয়েছে। আসামি জামিনের আবেদনও করেননি। তবে তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়া পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম এগোবে না।”

তদন্ত কর্মকর্তা শরিফ ইবনে আলম জানান, তদন্তকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে এবং চার্জশিট প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, “তদন্ত শেষ হয়েছে। আমরা চার্জশিট প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছি এবং সাক্ষীদের স্মারকলিপিও দাখিল করেছি। সেখান থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে চার্জশিট আদালতে পাঠানো হবে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) জমা দেওয়ার আগে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। কয়েকদিনের দিনের মধ্যেই আমরা প্রতিবেদন জমা দিতে পারব।”

তদন্তে বিলম্বের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি কতদূর কাজ করেছি বা করিনি, তা আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানেন। আমি তাদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। আপনার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য কি না, সেটাই আগে বলুন।”

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশি তদন্ত ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ঝাড়ফুঁকের সূত্র ধরে সুমাইয়ার পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হয় মোবারক হোসেনের। ঘটনার আগে প্রায় এক মাস তিনি নিয়মিত ওই বাসায় যাতায়াত করতেন। স্বীকারোক্তিতে তিনি জানান, সুমাইয়ার ওপর ঝাড়ফুঁক করার সময় তাকে ধর্ষণ করেন। বিষয়টি দেখে ফেলায় প্রথমে সুমাইয়ার মা তাহমিনা বেগমকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে সুমাইয়াকেও হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর বাসা থেকে চারটি মোবাইল ফোন ও একটি ল্যাপটপ নিয়ে পালিয়ে যান তিনি।

অভিযুক্ত মোবারক হোসেন কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের বাসিন্দা। পেশায় তিনি ঝাড়ফুঁক ও কবিরাজির কাজ করতেন এবং কুমিল্লা নগরীর একটি মসজিদে খাদেম হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন।

Link copied!