প্রকাশিত: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
নুসরাত জাহান কিন্নরী
বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন জনপ্রতিনিধির সাফল্য কেবল নির্বাচনে জয়লাভের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনগণের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে উন্নয়নকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া এবং বিদ্যমান সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধানে ভূমিকা রাখার মধ্যেই তার দায়িত্বের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটে। মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা, স্থানীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে জনসেবার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করাই একজন জনপ্রতিনিধির জন্য অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এই প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের দায়িত্ব গ্রহণের পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও উদ্যোগ আলোচনায় এসেছে।
মীর হেলালের দায়িত্বের বিস্তার: স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় প্রশাসনে
২০২৬ সালের নির্বাচনের পর চট্টগ্রাম-৫ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পাশাপাশি ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান ব্যারিস্টার মীর হেলাল। ফলে তার দায়িত্বের পরিধি কেবল হাটহাজারী ও বায়েজিদকেন্দ্রিক স্থানীয় উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও প্রশাসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও তা বিস্তৃত হয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে মার্চে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পান। একই সঙ্গে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি হিসেবে তাকে একাধিক স্তরে কাজ করার সুযোগ তৈরি হয়।
মীর হেলালের উন্নয়ন পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম-৫: বৈচিত্র্যময় এলাকার ভিন্ন চাহিদা
চট্টগ্রাম-৫ একটি বৈচিত্র্যময় সংসদীয় এলাকা। হাটহাজারীর বিস্তৃত গ্রামীণ জনপদের পাশাপাশি বায়েজিদের নগরসংলগ্ন এলাকাও এ আসনের অন্তর্ভুক্ত। ফলে দুই অঞ্চলের মানুষের উন্নয়ন চাহিদা ও স্থানীয় সমস্যার ধরনেও রয়েছে পার্থক্য।
কোথাও সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন, কোথাও জলাবদ্ধতা নিরসন; আবার কোথাও শিক্ষা, নিরাপদ পানি, বিদ্যুৎ ও সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। এই বৈচিত্র্যময় প্রয়োজনকে সামনে রেখে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম কয়েক মাসে বিভিন্ন খাতে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের তথ্য সামনে এসেছে।
মীর হেলালের প্রথম ১৮০ দিন: ৩২৯ প্রকল্পে উন্নয়নের বিস্তৃতি
চট্টগ্রাম-৫ আসনে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম ১৮০ দিনে ৩২৯টি উন্নয়ন প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার তথ্য এ সময়ের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বিষয়। বাসসের ২০ আগস্ট ২০২৬-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম ১৮০ দিনে বাস্তবায়নের জন্য নির্ধারিত ৪৫০টি প্রকল্পের মধ্যে ৩২৯টি প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। আরও ৪৮টি প্রকল্প তখন বাস্তবায়নাধীন ছিল এবং সামগ্রিক অগ্রগতির হার ছিল ৬৪ শতাংশ।
এসব প্রকল্পের আওতা ছিল বিস্তৃত। স্থানীয় সড়ক, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, খাল খনন, জলাবদ্ধতা নিরসন, পানি সরবরাহ, বিদ্যুৎ ও সেচব্যবস্থার পাশাপাশি মসজিদ, ঈদগাহ, মাদরাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মন্দির ও শ্মশানের উন্নয়নকাজও এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রতিবেদনে ১২টি সেতু ও কালভার্ট এবং জলাবদ্ধতা ও খালসংক্রান্ত ১৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নের তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
মীর হেলালের পার্বত্য উন্নয়ন ভাবনা: অবকাঠামো, সেবা ও পরিবেশের সমন্বয়
চট্টগ্রাম-৫-এর স্থানীয় উন্নয়নের পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মীর হেলালের দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পার্বত্য অঞ্চলের অবকাঠামো, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব পর্যটন বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় পানি সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টিও সরকারি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ভৌগোলিকভাবে দুর্গম ও বৈচিত্র্যময় এসব এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনায় অবকাঠামোর পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মৌলিক সেবার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মীর হেলালের প্রযুক্তিনির্ভর ভূমিসেবা: নাগরিক সেবায় ডিজিটাল রূপান্তর
ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর ভূমিসেবাকে আরও সহজ ও প্রযুক্তিনির্ভর করার উদ্যোগও আলোচনায় এসেছে। বাসসের প্রতিবেদনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, রেজিস্ট্রেশন ফি জমা, খতিয়ান ও ডি-সিআরসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা একটি স্বয়ংক্রিয় অ্যাপের মাধ্যমে প্রদানের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
ভূমিসেবার এই ডিজিটাল রূপান্তরের লক্ষ্য হচ্ছে নাগরিকদের জন্য সেবা গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও সহজ, দ্রুত ও কম সময়সাপেক্ষ করা। দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে প্রযুক্তির ব্যবহার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মীর হেলালের সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারে উদ্যোগ: দখলমুক্তির দিকে নজর
স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণ ও দখলমুক্ত করার বিষয়েও উদ্যোগের তথ্য পাওয়া গেছে। হাটহাজারীর সরকারহাট বাজারসংলগ্ন মির্জাপুর মৌজায় আনুমানিক এক কোটি টাকা বাজারমূল্যের তিন শতক সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি সরকারি জমি ও খাল দখলমুক্ত করার বিষয়টিকেও স্থানীয় উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণ, জলাধার ও খাল রক্ষা এবং জনস্বার্থে এসব সম্পদের যথাযথ ব্যবহার স্থানীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মীর হেলালের প্রথম ছয় মাস: স্থানীয় উন্নয়ন ও প্রশাসনিক দায়িত্বের সমান্তরাল যাত্রা
চট্টগ্রাম-৫-এর স্থানীয় উন্নয়ন থেকে শুরু করে ভূমিসেবা ডিজিটালাইজেশন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনা—মীর হেলালের দায়িত্বের ক্ষেত্রটি একই সময়ে একাধিক স্তরে বিস্তৃত হয়েছে। প্রথম ১৮০ দিনে ৩২৯টি প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার তথ্য, ভূমিসেবায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারি সম্পত্তি উদ্ধারের উদ্যোগ তার দায়িত্বের বিভিন্ন দিককে সামনে নিয়ে এসেছে।
তবে এসব উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়নের জন্য প্রকল্পগুলোর স্থায়িত্ব, বাস্তব উপকারভোগীর সংখ্যা, কাজের গুণগত মান এবং ভবিষ্যতে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়-এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে। একজন জনপ্রতিনিধির কর্মকাণ্ডের প্রকৃত মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে তার উদ্যোগগুলো কতটা টেকসইভাবে জনগণের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে, তার ওপর।

নুসরাত জাহান কিন্নরী
শিক্ষার্থী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগ। সহ ছাত্রী বিষয়ক সম্পাদক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল
