প্রকাশিত: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১১:১০ পিএম
বুকভরা স্বপ্ন, সাহস আর প্রত্যয় নিয়ে ঠিক দুই বছর আগে রাজপথে নেমেছিল পরিবর্তনের স্বপ্নে বিভোর বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিল যে শক্তি, দুই বছর পর কেন তাদের মধ্যে বিভক্তির সুর? যে রোজ নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির স্বপ্নে মানুষ রাজপথে নেমেছিল, সেই প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে? যে প্রত্যাশা নিয়ে আন্দোলনে নেমেছিলো ছাত্রজনতা তার কতটুকুই বা পূরণ হয়েছে তা আজ প্রশ্নের দাবি রাখে। আব্দুল্লাহ আল মামুন সে বিষয়টি নিয়ে মতামত তুলে ধেরেছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তিতে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির কথা জানতে চাইলে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী হালিমা খাতুন কেয়া বলেন, ‘তাজা রক্তে লেখা জুলাই আজ ইতিহাসের দীপ্ত অধ্যায়; ত্যাগের শপথের কাণ্ডারি হয়ে জেগে উঠুক প্রত্যয়।’
গণঅভ্যুত্থানের আজ দুই বছর পূর্তি। এ যেন এক অগ্নিসংযোগে দগ্ধ হৃদয়ের স্মৃতি!
বৈষম্য, দুর্নীতি, জবাবদিহিতার অভাব এবং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে গড়ে ওঠা এই গণআন্দোলন আজ ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল এক অধ্যায়।
২০২৪ সালে এক গর্জনশীল প্রজন্মের হুঙ্কারে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যায় স্বৈরাচারী শাসকশ্রেণি।
শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা ছিল না আকাশকুসুম; ছিল একগুচ্ছ স্বপ্নের তোড়ায় বাঁধা। প্রত্যাশা ছিল একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার, যেখানে আইনের শাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিতে মেধাভিত্তিক নিয়োগ, রাজনৈতিক অধিকার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
কিছুটা আক্ষেপ নিয়েই বলতে হচ্ছে, দুই বছরে অল্পসংখ্যক ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষণীয় হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই টানাপোড়েন রয়ে গেছে। তবে জনগণ ও শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক সচেতনতা আরও সোচ্চার হয়েছে।
শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, শিক্ষা ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত সংস্কার, বেকারত্ব হ্রাস, দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ এবং সামগ্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে এখনো প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জিত হয়নি।
এর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং শিক্ষাজীবন শেষে চাকরির সংকট শিক্ষার্থীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাস্তবতায় শিক্ষার্থীদের গুরুত্ব ও ভূমিকা তুলনাতীত। কেবল আন্দোলন নয়, বরং গবেষণা, উদ্ভাবন, সামাজিক দায়িত্ববোধ এবং গণতান্ত্রিক চর্চার মাধ্যমে দেশের
মেরুদণ্ড সোজা করার প্রত্যয়ই হোক আজকের ৩৬ জুলাইয়ের নতুন অধ্যায়ের নকশা।
জুলাই সত্য, জুলাই স্বপ্ন।
জুলাই প্রত্যয়—তবে একসঙ্গে চলো। ভালোবাসি বাংলাদেশ, দীপ্ত প্রাণের আলো।
অর্থনীতি বিভাগের ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী আশরাফুল ইসলাম বলেন, "দুই বছর পর প্রাপ্তির খাতায় সবচেয়ে বড় অর্জন হলো বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে মৌলিক সংস্কারের সূচনা। পাশাপাশি, তরুণদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সচেতনতা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় সোচ্চার থাকার সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার সমীকরণ পুরোপুরি মেলেনি; শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন ও তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি আশা অনুযায়ী দৃশ্যমান হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ধীরগতির সংস্কার শিক্ষার্থীদের মনে মাঝে মাঝে হতাশার সৃষ্টি করেছে। এসব আশা-হতাশা নিয়ে কখনো একটা জাতি পূর্ণাঙ্গ মুক্তি পেতে পারে না।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তাসমিয়া ইয়াসমিন বলেন, "৩৬ জুলাই—ক্যালেন্ডারের পাতায় যার কোনো অস্তিত্ব নেই, কিন্তু ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিতে যে দিনটি একটি ঐতিহাসিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দেশত্যাগ করার মধ্য দিয়ে একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়ের অবসান ঘটে। কিন্তু আমার কাছে ৩৬ জুলাই শুধু একটি সরকারের বিদায়ের দিন নয়; এটি একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের প্রতীক।
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি চাই বেকারত্ব কমিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা হোক। যারা উদ্যোক্তা হতে চায়, তারা যেন চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব, হয়রানি ও প্রতারণার শিকার না হয়ে নিরাপদ পরিবেশে উদ্যোগ গড়ে তুলতে পারে। গরিব-ধনী, শহর-গ্রাম নির্বিশেষে রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যেক নাগরিক যেন সমান মূল্যায়ন পায়।
আমার সবচেয়ে বড় প্রত্যাশাগুলোর একটি ছিল বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার। রাষ্ট্রক্ষমতায় যে দলই থাকুক, সরকারের প্রশংসা যেমন করা যাবে, তেমনি গঠনমূলক সমালোচনাও করা যাবে। নাগরিক অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে কোনো আবরার ফাহাদকে যেন আর জীবন দিতে না হয়। মিথ্যা অভিযোগ, গুম, হয়রানি কিংবা কোনো তকমা দিয়ে মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করা যেন আর কখনো স্বাভাবিক না হয়।
দুই বছর পর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি—আমরা প্রশ্ন করতে শিখেছি এবং রাষ্ট্রের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করার সাহস পেয়েছি। কিন্তু প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির হিসাব মেলালে এখনো অপূর্ণতার পাল্লাই ভারী। কোটা ও বৈষম্য, বেকারত্ব, উদ্যোক্তা হওয়ার পথে বাধা, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি, বাকস্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার—এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হলো গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা। প্রতিটি মৃত্যু ও গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে পরিচয় বা ক্ষমতা বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচার হতে হবে প্রতিহিংসার নয়, সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন এবং শহীদ পরিবারের যথাযথ স্বীকৃতি ও সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে। আমার আশঙ্কা, আমরা যেন শুধু শাসকের মুখ পরিবর্তন করে থেমে না যাই। যে বৈষম্য, অন্যায়, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতা রাজপথে নেমেছিল, তা যেন নতুন কোনো পরিচয়ে আবার ফিরে না আসে।
গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সার্থকতা সেদিনই আসবে, যেদিন ৩৬ জুলাই শুধু একটি স্মৃতি নয়, রাষ্ট্রের জন্য একটি স্থায়ী শিক্ষা হয়ে থাকবে—রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ এবং জনগণের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্ব। সেই বাংলাদেশই আমার প্রত্যাশার বাংলাদেশ।"
অর্থনীতি বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হতাশা প্রকাশ করে বলেন, "বলার অপেক্ষা রাখে না যে উদ্দেশ্য এবং বৃহৎ লক্ষ্য নিয়ে ছাত্র-জনতা গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল, আজ তা প্রায় হাইজ্যাক হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি বলতে আর্যভট্টের আবিষ্কৃত শূন্য ছাড়া আর কিছুই না। ঘটা করে কিছু যদি বলতেই হয়, তা হবে বঞ্চনা, প্রতারণা আর লম্বা শহীদের তালিকা; প্রাপ্তি বলতে আর কিছুই নেই। শেষ অবধি শিক্ষার্থীরা এ-ই পেয়েছে। আগামীতে প্রত্যাশা পূরণের সম্ভাবনাও শূন্যের কোঠায়। যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সে আন্দোলনের ফসল আমরা ঘরে তুলতে পারিনি। রাজনীতিবিদদের অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত, একতার অভাব এবং পার্শ্ববর্তী দেশের অসহযোগিতা ক্রমান্বয়ে অভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রত্যাশায় সৃষ্টি করেছে প্রবঞ্চনা। সেই সুযোগে স্বার্থান্বেষী মহল পূর্বের ফ্যাসিবাদকে স্বাভাবিক (নরমালাইজ) করতে বলতে শুরু করেছে, 'এর চেয়ে আগেই ভালো ছিল।' চরিতার্থ করছে তাদের ঘৃণ্য, পরাজিত আকাঙ্ক্ষা।"
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সৃষ্টি বলেন, "গণঅভ্যুত্থান দেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার দাবিকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা করেছে। তাদের আশা ছিল নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং মেধাভিত্তিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এসব প্রত্যাশা পুরোটা পূরণ করতে পারেনি। বর্তমান নির্বাচিত সরকার শিক্ষার মানোন্নয়ন, সেশনজট নিরসন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগে আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে প্রত্যাশা রাখি। আশা করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বল্প সময়ের মধ্যে এগুলো বাস্তবায়ন করবেন। গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্জিত হবে, যখন শিক্ষার্থীদের ন্যায্য প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ পাবে এবং একটি গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।"
বোটানি বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মেহরাব হাসান জাকির বলেন, "জুলাই অভ্যুত্থান ছিল আমাদের অধিকার আদায়, বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা ও স্বৈরাচার পতনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
এই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষার্থীদের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা হলো বৈষম্যহীন, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক একটি আদর্শ সমাজব্যবস্থা দেখা, যেখানে থাকবে না কোনো সরকারি দল বা বিরোধী দলের অগ্রাধিকার; যেখানে অগ্রাধিকার পাবে ব্যক্তির যোগ্যতা ও দক্ষতা।
আমাদের এমন প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে আমরা অনেকাংশেই বিপরীত চিত্র দেখতে পাই, যেখানে ক্যাম্পাসগুলো চলছে অপসংস্কৃতি ও অরাজনৈতিকতায়। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যা শিক্ষার্থীরা কখনোই চায় না।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ, শিক্ষার মানোন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তায় আরও কার্যকর পরিবর্তন এনে গণঅভ্যুত্থানের অর্জনগুলো সংরক্ষণ করে একটি সুন্দর ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলবেন।"
