আব্দুল্লাহ আর রাফি,গোবিপ্রবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:২০ এএম
রবিবার ১৬, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --
ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট
অচেনা মুখ, নতুন পরিবেশ আর এক বুক কৌতূহল-বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিন মানেই এক মিশ্র আবেগের ক্যানভাস। ভর্তি যুদ্ধ অতিক্রম করে অবশেষে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ আঙিনায় থিতু হয়েছে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের একঝাঁক নতুন মুখ। সেন্ট্রাল লাইব্রেরির কদমগাছ আর ক্যাফেটেরিয়ার চিরচেনা আড্ডাগুলো যেন নবীনদের পদচারণায় আজ নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
ঘর ছেড়ে বহু দূরে এসেও জ্যেষ্ঠদের সহমর্মিতা আর শিক্ষকদের শিক্ষকসুলভ অভিভাবকত্বে এই ৫৫ একরকে আপন করে নিতে সময় লাগেনি তাদের। শুধু অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা নয়, খেলাধুলা, মুক্তচিন্তা ও উদ্ভাবনী পরিবেশের মধ্য দিয়ে নিজেদের বিকশিত করতে চায় এই নতুন প্রজন্ম। শত সংকট পেরিয়ে এই প্রিয় ক্যাম্পাসটিকেই তারা বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন বুুনছে। নবীন শিক্ষার্থীদের মনের সেই ভালো লাগা, পাওয়া-না পাওয়া ও আগামীর প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেছেন গোবিপ্রবির অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ তায়ীম খান।
"নবীনদের পদচারণায় মুখরিত ৫৫ একর":
সাদিয়া ফারহানা
বিভাগ - ইংরেজি,শিক্ষাবর্ষ - ২০২৫ - ২০২৬
মাধ্যমিক শেষ করে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হবার পরেই, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন মনের কোণে উঁকি দিয়েছিল। সেই স্বপ্ন সত্যি হলো এবং ৫৫ একরের মাটি আমাকে আপন করে নিয়ে স্থান দিলো। দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যালয় (গোবিপ্রবি), যার প্রতিটি ইট-পাথরের কোণাকে ভীষণ আপন মনে হচ্ছে। ক্যাম্পাসের পথঘাট, মুক্তমঞ্চ, ক্যাফেটেরিয়া, লেকপাড়, লাইব্রেরি আর সবুজ বনানী যেন ভীষণ মুখরিত।
নবীনদের কলকাকলিতে, পুরো ক্যাম্পাসের নিস্প্রাণ দেয়ালগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
এই ৫৫ একরকে কেন্দ্র করে আমাদের ভবিষ্যতের প্রত্যাশাগুলো ও অনেক সুদূরপ্রসারী। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন,“বিশ্ববিদ্যালয়ের মূখ্য কাজ জ্ঞানের উৎপাদন, গৌণ কাজ অর্থ বিতরণ।”
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুধুই বিদ্যার চার দেয়ালে নয়; এটি আত্মিক রূপান্তর, মননশীলতার বিকাশ। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তথা এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমাদের নেতৃত্বগুণ ও মানবিকতার বিকাশ ঘটাতে চাই।
নতুন পরিবেশে এসে আবাসন সুবিধা প্রতিটি নবীনেরই অন্যতম প্রধান চাওয়া থাকে। তাই প্রথম বর্ষ থেকেই যেন।
প্রতিটি শিক্ষার্থী হলে সিট পায় অথবা সহজে সিটের সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। এর পাশাপাশি ক্যাম্পাসের স্বাস্থ্য সেবা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।ক্যাম্পাসে পর্যাপ্ত লাইটিং ব্যবস্থা এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি, যা শিক্ষার্থীদের রাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। নবীনদের জন্য পর্যাপ্ত সেন্ট্রাল বা কেন্দ্রীয় মিলনায়তন নেই, যা সময়ের দাবি।
সবশেষে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়ন ও সংস্কারই পরিবেশকে পরিবেশবান্ধব এবং মুখর করতে ভূমিকা রাখে।
সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সমৃদ্ধ বইয়ের কালেকশন, নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনার সুবিধা, শিক্ষার্থীদের দিয়ে যাওয়া ব্যবস্থাগুলো আরও উন্নত করা উচিত। সেন্ট্রাল স্পোর্টস ডিসিপ্লিন বা বিষয়ভিত্তিক অ্যাকাডেমিক চার্চিসল ক্লাবের মান উন্নত করা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্যানেলে কিঞ্চিৎ সীমাবদ্ধতা থাকলেও, সিনিয়রদের সহযোগিতা ও উৎসাহ প্রদান প্রত্যাশা - সিনিয়রদের প্রশংসনীয় বা দুর্বলতাকে প্রসাদ না দিয়ে সবসময় ‘হেল্পফুল’ অ্যাটিটিউড রাখা প্রয়োজন।
সব ছাত্র-ছাত্রীদের সুস্বাস্থ্য লাভ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অ্যাকাডেমিক ফিমেড় স্থান বা ডিস্পেনসারি সুবিধা প্রদান করা লাভ।
পরিশেষে, আমরা শুধুই একটি ডিগ্রি নিতে চাই না, আমরা চাই যে এই ৫৫ একর আমাদের একটি সুন্দর সামাজিক, নৈতিক, দায়িত্বশীল এবং প্রজ্ঞাবান মানুষ হিসেবে গড়ে তুলুক। নবীনদের প্রাণবন্ত আগমন এবং ক্যাম্পাসের ঐতিহ্যবাহী দূরদর্শিতার সমন্বয়ে গোবিপ্রবি হয়ে উঠুক বাংলাদেশ সেরা বিদ্যাপীঠ এক মানবিক ও জ্ঞানসমৃদ্ধ প্রাঙ্গণ।
৫৫ একরে প্রথম পদচারণা:
নাম: হালিমা ইসলাম মিফতা
বিভাগ: পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ,সেশন: ২০২৫–২৬
বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবার ৫৫ একরের ক্যাম্পাসে পা রাখার অনুভূতিটা আজও বেশ মনে পড়ে। চারপাশে নতুন মুখ, নতুন ভবন আর অচেনা পথ,সবকিছুই ছিল একসঙ্গে আনন্দের এবং কিছুটা বিভ্রান্তির। মনে হচ্ছিল, এত বড় ক্যাম্পাসে আমি যেন নিজেই নিজের পথ খুঁজে বেড়াচ্ছি।
প্রথম দিনের একটি ঘটনা বিশেষভাবে মনে গেঁথে আছে। ক্যাফেটেরিয়া কোথায়, সেটাই খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কাউকে ঠিকমতো চিনি না, তাই জিজ্ঞেস করতেও একটু সংকোচ হচ্ছিল। ক্যাফেটেরিয়া খুঁজতে খুঁজতে প্রায় পুরো ক্যাম্পাস ঘুরে ফেললাম। শেষ পর্যন্ত এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে ছেলেদের হলের সামনে গিয়ে বসে পড়ি। তখন একজন বড় ভাই আমাকে দেখে কোথায় যেতে চাই জিজ্ঞেস করেন। আমার কথা শুনে তিনিই আমাকে ক্যাফেটেরিয়া পর্যন্ত নিয়ে যান। ছোট্ট এই ঘটনাটিই নতুন ক্যাম্পাসের অন্যতম সুন্দর স্মৃতি হয়ে আছে।
আরেকটি স্মৃতি আমাদের বিভাগের চেয়ারম্যান স্যার ড. রাশেদুজ্জামান পবিত্র স্যারকে ঘিরে। ক্লাস শুরুর পর স্যার আমাদের প্রত্যেককে একটি করে হীরার আংটি উপহার দিয়েছিলেন। মুহূর্তটি আমাদের সত্যিই বিশেষ অনুভব করিয়েছিল। পরে অবশ্য জানতে পারি, স্যার প্রতিটি ব্যাচকেই এমন আংটি দিয়ে থাকেন! স্যার মজা করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি যদি কখনো সত্যিকারের একটি হীরার খনি খুঁজে পান, তাহলে আমাদের সত্যিকারের হীরার আংটি দেবেন। তাই সবার কাছে আমাদের ছোট্ট অনুরোধ,স্যারের জন্য দোয়া করবেন, স্যার যেন সত্যিই একটি হীরার খনি খুঁজে পান, আর আমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত হীরার আংটিও দেন!
এই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে আমার প্রত্যাশাও অনেক। পড়াশোনার পাশাপাশি লেখালেখি, বিতর্ক, সহশিক্ষা কার্যক্রম ও সৃজনশীল কাজে নিজেকে যুক্ত করে একজন দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে চাই। আজ যে জায়গাগুলো অচেনা, একদিন সেগুলোই হয়ে উঠবে অসংখ্য স্মৃতির অংশ। এই ৫৫ একর থেকেই শুরু হোক আমার স্বপ্নের পথচলা।
প্রথমদিনের অনুভূতি ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভবিষ্যতে প্রত্যাশা
সামিহা জান্নাত রিংকি
ডিপার্টমেন্ট : টুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজম্যান্ট ,সেশন: ২৫-২৬
প্রথমদিন ক্যাম্পাসের মেইন গেইটে এসে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামফলকের দিকে থাকিয়ে বলেছিলাম :
এসেছি আমি বহুদূর হতে..
প্রিয় ক্যাম্পাস তুমি ছিলে মোর হৃদয়ের গহীনে।
এই তো আমি পেরেছি তোমায় ছুঁতে,
রাখিও আমায় তোমারি সেহ্ণডোরে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম দিনটি প্রতিটি শিক্ষার্থীর জীবনেই একটি অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। বিদ্যালয় ও কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে এক মুক্ত, বিশাল ও নতুন পরিবেশে পা রাখার আবেগ খুবই গভীর।
ক্যাম্পাসে পা রাখার মুহূর্তেই এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করেছিলাম। চারপাশের পরিচিত পরিবেশের বদলে নতুন মুখ, বিশাল প্রশাসনিক ভবন, সবুজ চত্বর আর ক্যাফেটেরিয়ার কোলাহল-সবকিছুই ছিল একেবারেই নতুন।প্রথমদিন এসে পা রেখে ক্যাম্পাসে চোখ বুলাতেই মনের মধ্যে কিছু লাইন বারাবার বেজে যাচ্ছে :
সবুজ পাতায় রোদের খেলা, অজানা সব গলি
নতুন ক্যাম্পাসে নতুন করে জীবনের গল্প বলি।
অচেনা এই ইটের ভবনে স্বপ্ন বুনি কত,
এই আঙিনা আপন হবে হাজার দিনের মতো।
প্রথম দিন ক্লাসে গিয়ে একদিকে যেমন নতুন সহপাঠীদের সাথে পরিচিত হওয়ার আনন্দ ছিল, অন্যদিকে অচেনা পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার কিছুটা দ্বিধাবোধও কাজ করছিল। তবে শিক্ষকদের উষ্ণ অভ্যর্থনা এবং সিনিয়রদের আন্তরিক ব্যবহার সেই দ্বিধা দূর করে মনে এক নতুন আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়। নিজের ভেতরে এক ধরণের স্বাধীন ও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে ওঠার অনুভূতি জেগেছিল সেদিন।
এই ক্যাম্পাসকে ঘিরে আমার ভবিষ্যৎ প্রত্যাশাও অনেক গভীর। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পুঁথিগত বিদ্যা অর্জনের স্থান নয়, বরং নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের ক্ষেত্র। আগামী বছরগুলোতে আমি এখানকার সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি এবং সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চাই। বিশ্বমানের শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি বিতর্ক, সাহিত্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে নিজের নেতৃত্ব ও যোগাযোগের দক্ষতা বৃদ্ধি করা আমার অন্যতম লক্ষ্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে শুধু ভালো সিজিপিএ অর্জন করাটায় নই, পাশাপাশি দেশের শীর্ষস্থানীয় এই পরিবেশ থেকে অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে একজন যোগ্য, দক্ষ ও মানবপ্রেমী নাগরিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাই। ক্যাম্পাস জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে সুন্দর একটি ভবিষ্যত গড়ে তোলা এবং নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে গর্বিত করাই আমার প্রধান প্রত্যাশা।
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে আমার অনূভুতি ও প্রত্যাশা
ছামিয়া ইয়াসমিন মুন।
ইতিহাস বিভাগ।২৫-২৬ সেশন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি শুধু শিক্ষা জীবনের নতুন একটা অধ্যায়ই নয়,বরং নতুন স্বপনের সূচনা। অনেক পরিশ্রম,র্নিঘুম রাত, এবং আমার পিতামাতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনেক দোয়ার পর আজ আমি গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়ে নিজেকে গর্বিত মনে করি।আমি আমার এই প্রাপ্তির জন্য আমার শ্রষ্টা, আমার পিতামাতা ও শিক্ষকদের কাছে চির কৃতজ্ঞ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দর মনোরম পরিবেশ, শিক্ষক বড় ভাই,বোন,এবং সহপাঠীদের আন্তরিকতার জন্যই এই ৫৫ একর অল্প কিছু দিনের ভিতরেই আমার প্রানের ঠিকানা হয়ে উঠেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছ একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন,বিভিন্ন শিক্ষামূলক সংগঠন,মসজিদ, মন্দির, ইত্যাদি।তাছাড়াও আমাদের রয়েছে গবেষণা চর্চা ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ যা আদর্শ মানুষ গড়ায় সহায়ক।
আমি প্রত্যাশা করি একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে আমি আমার দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারব।আমার শ্রদ্ধীয় শিক্ষকদের সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে আর্দশ মানুষ হয়ে আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং আমার পিতামাতার মুখ উজ্জ্বল করব সর্বপরি দেশের কল্যানে নিয়োজিত হব।এটাই আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একমাত্র প্রত্যাশা।