সোমবার ০৮, জুন ২০২৬

সোমবার ০৮, জুন ২০২৬ -- : -- --

হাওরের ধান তলিয়ে নিঃস্ব ৫০ হাজার কৃষক

মৌলভীবাজার থেকে রাজন হোসেন তৌফিক

প্রকাশিত: ০৭ জুন ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম

ছবি।ক্যাম্পাস রিপোর্ট

অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজার জেলার অন্তত ১৫টি ছোট-বড় হাওরের বোরো ফসল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরসহ জেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে হাজারো কৃষক তাদের বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে চরম সংকটে পড়েছেন। এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রস্তুত করা সরকারি সহায়তার তালিকায় অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার বিভিন্ন হাওরে প্রায় ৪ হাজার ২০০ হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ২৭ হাজার ৪৬৩ জন এবং আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮০ কোটি টাকা। তবে স্থানীয় কৃষক সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা ৫০ হাজারেরও বেশি।

কমলগঞ্জ উপজেলার কেওলার হাওরের কৃষক মো. আনোয়ার খান বলেন, "এবার বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছিল। কিন্তু কাটার আগেই সব ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ঋণ করে চাষ করেছিলাম, এখন সেই ঋণ শোধ করব কিভাবে বুঝতে পারছি না। তালিকায় অনেক প্রকৃত কৃষকের নাম নেই। আমরা সঠিক তদন্ত চাই।"

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রস্তুত করা সহায়তার তালিকায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পরিবর্তে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্বজন, অকৃষক, প্রবাসী এবং দীর্ঘদিন কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন—এমন ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষক সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন।

কুলাউড়া উপজেলার হাকালুকি হাওরের কৃষক আলী মিয়া বলেন, "বোরো ধানই আমাদের একমাত্র ভরসা। এবার কোনো ফসল ঘরে তুলতে পারিনি। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রকাশ করা হোক, যেন প্রকৃত কৃষকরা সহায়তা পায়।"

একই অভিযোগ তুলে রাজনগরের কৃষক আব্দুল করিম বলেন, "আমরা মাঠে ফসল হারিয়েছি, এখন তালিকাতেও হারিয়ে যাচ্ছি। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে যদি তালিকা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব"

হাওরভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বলছেন, এ দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বর্গাচাষিরা। অন্যের জমি চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করা এসব কৃষক ফসল হারিয়ে পরিবার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।

মৌলভীবাজার হাওর রক্ষা আন্দোলন সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক আসম সালেহ সোহেল বলেন, "প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। বিশেষ করে বর্গাচাষিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়লেও তালিকায় তাদের অনেকেই স্থান পাননি। অথচ অনেক প্রকৃত কৃষকের নাম তালিকায় ওঠেনি। দ্রুত সঠিক জরিপ করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।"

সরকারের পক্ষ থেকে ১২ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের জন্য সহায়তা বরাদ্দের অনুমোদন দেওয়া হলেও তা এখনও পুরোপুরি মাঠপর্যায়ে পৌঁছেনি। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত সহায়তা বিতরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাবেল জানান, বরাদ্দ পাওয়া সহায়তা দ্রুত বিতরণ করা হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, তালিকা পুনর্মূল্যায়ন এবং সরেজমিন তদন্ত ছাড়া প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা তাদের ন্যায্য সহায়তা পাবেন না।

Link copied!