শুক্রবার ১৫, মে ২০২৬

শুক্রবার ১৫, মে ২০২৬ -- : -- --

"হলই এখন পরিবার: রক্তের সম্পর্ক নয়,তবুও আপন"

সানজানা শওকত,বুটেক্স প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১৫ মে ২০২৬, ০২:১১ পিএম

ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট

রাত তখন প্রায় সাড়ে ১২টা। ক্লাস, ল্যাব আর দিনের ব্যস্ততা শেষে হলের নিজ রুমে ছোট্ট খাটে বসে অ্যাসাইনমেন্ট করছিলেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুটেক্স) ফেব্রিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রেজওয়ান আহমেদ অন্তর। ঠিক তখনই ফোন আসে বাসা থেকে। ওপাশ থেকে কথার শুরুতেই মা জিজ্ঞেস করেন, “বাবা, খেয়েছিস তো?” ছোট্ট করে “হ্যাঁ মা” বললেও, ফোন কেটে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকেন তিনি। পাশে থাকা বন্ধু বলে ওঠে, “চল ভাই, নিচে গিয়ে চা খাই।” 

পরিবার থেকে দূরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জীবনে এমন ছোট ছোট মুহূর্তই ধীরে ধীরে নতুন এক পরিবারের জন্ম দেয়-যেখানে রক্তের সম্পর্ক নেই, কিন্তু আছে পাশে থাকার নিশ্চয়তা। 
আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস উপলক্ষে বুটেক্সের বিভিন্ন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এসেছে ক্যাম্পাস জীবনের এক ভিন্ন বাস্তবতা-একাকীত্ব, মানসিক চাপ, বন্ধুত্ব আর নতুন সম্পর্কের গল্প।

ইয়ার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৪৮তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তানভীর আনজুমের কাছে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল রাতগুলো। দিনের ব্যস্ততা, ক্লাস কিংবা বন্ধুদের আড্ডার মাঝেও রাত নামলেই হঠাৎ করে বাসার কথা খুব মনে পড়ত তার। তার ভাষায়, “মনে হতো, হয়তো মা এখনও জেগে আছেন-শুধু ছেলের একটা ফোনের অপেক্ষায়। তানভীর জানান, দিনের শেষে বাসায় ভিডিও কলে কথা বলাটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় মানসিক স্বস্তির জায়গা। যত ব্যস্ততাই থাকুক, মা-বাবার মুখটা দেখলেই মনে হতো একটু হালকা লাগছে। 

টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৫০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আলামিনের কাছে হলজীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বন্ধুত্ব। অসুস্থতা কিংবা মানসিক চাপের মুহূর্তে বন্ধুদের ছোট ছোট যত্ন তাকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। তিনি বলেন, “একবার অসুস্থ হয়ে রুমে পড়ে ছিলাম। রাতে বন্ধুরা ওষুধ এনে দিয়েছে, খাবার এনে দিয়েছে। ওই সময় মনে হয়েছিল, বাসার মানুষ দূরে থাকলেও আমি একা না।” আবার ছুটি বা উৎসবের সময় বন্ধুরা আগে বাড়ি চলে গেলে ক্যাম্পাসটা অনেক ফাঁকা লাগে বলেও জানান তিনি। “তখন বুঝতাম, পরিবার শুধু বাসাতেই না-কিছু মানুষ দূরে থেকেও পরিবার হয়ে যায়।”

চার বছরের ক্যাম্পাস জীবনে হলজীবনকে একেবারে ভিন্নভাবে দেখেছেন টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ৪৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী রিপন কান্তি দে। তার কাছে হল জীবন শুধু পড়াশোনার অভিজ্ঞতা নয়, বরং নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার ও গড়ে তোলার একটি অধ্যায়। “হলজীবন শুধু একটা থাকার জায়গা না-এটা মানুষকে দায়িত্ব নিতে শেখায়, একা লড়তে শেখায়, আবার ছোট ছোট মুহূর্তে আনন্দ খুঁজে নিতেও শেখায়। এই জীবনই ধীরে ধীরে বুঝতে শেখায়, পরিবার শুধু রক্তের সম্পর্ক না। কঠিন সময়ে যে মানুষগুলো পাশে থাকে, তারাও একসময় পরিবার হয়ে যায়।"

 বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যস্ত করিডোর, রাতজাগা পড়াশোনা, টং-এর চা কিংবা দিনের শেষে বন্ধুদের সঙ্গে ছোট্ট আড্ডা-এসবের মাঝেই তৈরি হয় এক ধরনের অদৃশ্য সম্পর্ক। যেখানে দূরের শহরে থাকা কিছু তরুণ ধীরে ধীরে শিখে যায়, পরিবার শুধু জন্মসূত্রে পাওয়া মানুষ নয়; কঠিন সময়ে পাশে থাকা মানুষগুলোর নামও পরিবার।

Link copied!