শনিবার ০২, মে ২০২৬

শনিবার ০২, মে ২০২৬ -- : -- --

বাংলাদেশের কৃষিসম্পদ বনাম নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের অন্তরায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০২ মে ২০২৬, ১২:৫৯ এএম

কৃষিবিদ মো. ইব্রাহিম মিয়া । ফাইল ফটো।

সকল প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য যেমন অক্সিজেন প্রয়োজন তেমনই নিরাপদ খাদ্যও অত্যাবশ্যক। চতুর্থ শিল্প বিল্পবের যুগে আমরা বসবাস করছি, আধুনিকায়ন হচ্ছে বিশ্বের প্রতিটি ক্ষেত্রেই। তাই বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের সুস্থ জীবন ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিসম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা,রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব অতুলনীয়।মানব কল্যাণে ও কৃষি সম্পদের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এর শিক্ষক, গবেষক, নীতিনির্ধারক, সংশ্লিষ্ট গ্র্যাজুয়েটবৃন্দ, কৃষক-খামারী সমন্বিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই সমন্বিত প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রেখে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, পরিবেশ রক্ষা ও টেকসই কৃষি সম্পদের উন্নয়নে কিছু নীতিগত পরিবর্তন ও পদক্ষেপ নেওয়া অতি জরুরি। বর্তমানে কৃষি শিল্পে - কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদে নির্বিচারে যত্রতত্র ও অনিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান, বালাইনাশক,কীটনাশক, অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ প্রোমোটার সহ বিভিন্ন নামি-বেনামী নিষিদ্ধ রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করার জন্য কৃষক, খামারীদের প্ররোচিত করছে এক শ্রেণির অসাধু লোভী ব্যবসায়িক চক্র। যা পরিবেশ ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। সেই সাথে খাদ্যশৃঙ্খলে বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান প্রবেশ করে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়ছে।পরিবেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য যুগান্তকারী পদক্ষেপ ও সমাধান প্রয়োজন। 

বর্তমানে বাংলাদেশে পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ কৃষি, মৎস্য ও ভেটেরিনারি গ্র্যাজুয়েট রয়েছে। তাঁদের স্ব স্ব খাতে দক্ষতার সাথে কাজ করার জন্য কাঠামোগত ও সুনির্দিষ্ট নীতিগত পরিবর্তন খুবই প্রয়োজন। কৃষি, মৎস্য, ভেট. এর জন্য আলাদা আলাদা আধুনিক ও যুগোপযোগী সিলেবাস প্রনয়ণ করা হয়েছে যা দক্ষ মানব সম্পদ গড়তে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।ফলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে স্ব স্ব খাতের গ্র্যাজুয়েটবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে।সংশ্লিষ্ট স্ব স্ব খাতে নৈপুণ্য ও দক্ষতার সাথে কাজ করা লক্ষ্যে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের উচিত কৃষি কাউন্সিল ও মৎস্য কাউন্সিল গঠন করে তাঁদের রেজিস্ট্রার্ড করা, যাতে স্ব স্ব গ্র্যাজুয়েটরা সঠিক নিয়ম নীতিমালা অনুসরণ করে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। যেকেউ যেন নির্বিচারে যত্রতত্র অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক, বালাইনাশক,অ্যান্টিবায়োটিক,গ্রোথ প্রোমটার সহ বিবিধ নামী বেনামি, নিষিদ্ধ রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারে কৃষক, খামারীদের প্রতারিত করতে না পারে।এই যুগোপযোগী পদক্ষেপ হবে খাদ্য শৃঙ্খলে অবাধ রাসায়নিক উপাদানের প্রবেশ বন্ধ করার কার্যকর উপায়, স্ব স্ব বিষয়ের গ্র্যাজুয়েট ছাড়া পরামর্শ, ব্যবস্থাপত্র, চিকিৎসা প্রদান দণ্ডনীয় অপরাধ এবং আইনের আওতায় এনে বিচার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে,তাহলেই নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও টেকসই কৃষিসম্পদের বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ভেটেরিনারি কাউন্সিল এর প্রস্তাবিত একটি কোর্স কে কেন্দ্র করে ভেটেরিনারি ও মৎস্য সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিবর্গের মাঝে বিভ্রান্তি ও ভুল ধারণা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে, একে অপরের মাঝে ক্রোধের জন্ম দিচ্ছে যা সংশ্লিষ্ট খাতের টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার আশঙ্কা প্রকটভাবে বিরাজ করছে। 

তাই, আসুন বিষয়টি একটু পরিষ্কারভাবে জেনে নেই। 

বাংলাদেশের প্রচলিত নিয়ম, গেজেট, আইন ও নীতিমালা অনুযায়ী -

একজন ভেটেরিনারি ডাক্তার স্থলজ প্রাণী মানুষ ব্যতীত অন্য সকল প্রাণী এবং জলজ ক্ষেত্রে মাৎস্য ব্যতীত অন্য সকল প্রাণী যেমন কুমির, সাপ,কচ্ছপ বিষয়ে পরামর্শ, ব্যবস্থাপত্র ও চিকিৎসা প্রদান করবে।অন্য দিকে মাৎস্য বলতে সকল প্রকার মাছ,চিংড়ি,কুচিয়া,অ্যালজি,ফাইটোপ্লাংটন,জুপ্লাংটন প্রভৃতি ফিশারিজ ও মেরিন ফিশারিজ এর কোর্সে বিশদভাবে পড়ানো হয়। যা মাৎস্যবিজ্ঞানের গ্র্যাজুয়েট দ্বারা ব্যবস্থাপনা,পরামর্শ ও চিকিৎসা দেওয়ার জন্য যুগোপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন করে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। 

কৃষিবিপ্লব ও কৃষি শিক্ষার প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদ্যা ছিল - এগ্রিকালচার, সেটা থেকে ডিভিএম এবং ডিভিএম এর একটি অণু শাখা জলজ প্রাণী - শুধু মাৎস্য - মাছ, চিংড়ি, কুচিয়া প্রভৃতি নিয়ে ফিশারিজ ও অ্যাকুয়াকালচার । 

অর্থাৎ,এগ্রিকালচার -ডিভিএম-ফিশারিজ- অ্যাকুয়াকালচার বিদ্যা এভাবেই কালক্রমে প্রয়োজনের তাগিদে উন্নত সেবা ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন এবং টেকসই কৃষি সম্পদের উন্নয়নের জন্য জন্ম করা হয়েছে।

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে একজন দক্ষ ফিশারিজ গ্র্যাজুয়েট তৈরির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়াবলি পাঠদান করা হয়, যেমন -লিমনোলজি,ফ্রেশ এন্ড মেরিন ওয়াটার কেমিস্ট্রি,অ্যাকুয়াটিক সয়েল সাইন্স,অ্যাকুয়াটিক টক্সিকোলজি,অ্যাকুয়াটিক এনভায়রনমেন্ট এন্ড বায়োডাইভারসিটি, বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি, অ্যানালিটিক্যাল কেমিস্ট্রি, বায়োটেকনোলজি, জেনেটিক্স, মাইক্রোবায়োলজি, ফিশ প্যাথোলজি,অ্যাকুয়াটি ব্যাকটেরিওলজি এন্ড ভাইরিওলজি, ফিশ ফিজিওলজি, ফিশ অ্যানাটমি,ফিশ ব্রিডিং এন্ড হ্যাচারী অপারেশন,ফিশ ফার্মাকোলজি, ইকথাইয়োলজি, ফিশ ইমিউনোলজি,ফিশ ফিড নিউট্রেশন, ফিশ ফিড টেকনোলজি, মেরিন ফুড কেমিস্ট্রি, ফিশ ফুড প্রোসেসিং এন্ড প্রিজারভেশন,বায়োসিকিউরিটি এন্ড এইচএসিসিপি প্রিন্সিপলস,অ্যাকুয়াকালচার ইন্জিনিয়ারিং, ওশেনোগ্রাফি সহ আরো সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় পড়ানো হয়। তাই মাছ,চিংড়ি, কুচিয়া,মলাস্কা,অ্যালজি, ফাইটোপ্লাংটন ও জুপ্লাংটনসহ জলজ বাস্তুতন্ত্র ব্যবস্থাপনা,পরামর্শ ও চিকিৎসা প্রদানের জন্য একজন মাৎসবিজ্ঞান সংশ্লিষ্ট গ্র্যাজুয়েটের কাছেই অধিক নিরাপদ ও সুসংগত। সর্বোপরি কৃষি, মৎস্য,ভেট. সবার মূল একই এবং উদ্দেশ্যও একই মানব কল্যাণে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার প্রসার,টেকসই ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন সেইসাথে কৃষিসম্পদের উন্নয়ন বিকাশ নিশ্চিত করা।

 

কৃষিবিদ মো. ইব্রাহিম মিয়া 

শিক্ষার্থী - এমএসসি ইন অ্যাকুয়াকালচার।

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়,দিনাজপুর।

Link copied!