বুধবার ১৩, মে ২০২৬

বুধবার ১৩, মে ২০২৬ -- : -- --

মূলধারায় জনপ্রিয় হচ্ছে আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাবার

মংক্যএ মার্মা,কুবি প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১২ মে ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম

আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাবার। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের খাদ্যসংস্কৃতি বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যময়। এই ভূখণ্ডে বাঙালিদের পাশাপাশি চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, খাসিয়া ও সাঁওতালসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব খাদ্য ঐতিহ্য দেশের সামগ্রিক রন্ধনশৈলীকে সমৃদ্ধ করেছে। পাহাড়, বন, নদী ও জুমচাষনির্ভর জীবনব্যবস্থার ভেতর গড়ে ওঠা এসব খাবার কেবল পুষ্টির উৎস নয়; বরং ইতিহাস, উৎসব, সামাজিকতা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গবেষণা নিবন্ধ “Ethnic Food of Indigenous Peoples in Bandarban: A Cultural Treasure for Sustainable Tourism”-এ উল্লেখ করা হয়েছে, পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাবার স্থানীয় প্রকৃতি, জুমচাষ ও সামষ্টিক জীবনধারার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে বাঁশ কোড়ল, পাহাড়ি শাক, শুকনো মাছ বা শুঁটকি এবং ভেষজ উপাদাননির্ভর রান্না তাদের সংস্কৃতির স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করে।

চাকমা সম্প্রদায়ের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার ‘পাজন’। নানা ধরনের পাহাড়ি শাকসবজি, কচু, কুমড়া, বেগুন ও স্থানীয় ভেষজ একসঙ্গে রান্না করে তৈরি করা হয় এই পদ। বিজু উৎসবের সময় প্রায় প্রতিটি চাকমা পরিবারেই এটি রান্না করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক আলোচনা ও বিজু উদ্‌যাপনসংক্রান্ত বিভিন্ন লেখাতেও দেখা যায়, ‘মূল বিজু’ উদ্‌যাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো পাজন পরিবেশন।

মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও বাঁশ কোড়ল দিয়ে রান্না করা তরকারি অত্যন্ত জনপ্রিয়। বাঁশের কচি অংশ বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করে রান্না করা হয়। এই খাবার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপনের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। গবেষকদের মতে, বনজ সম্পদ ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত উপাদানের ব্যবহার তাদের টেকসই জীবনধারার পরিচায়ক।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আরেকটি সুপরিচিত খাবার ‘নাপ্পি’ বা ‘শিদল’। এটি মূলত গাঁজন করা মাছ, যা তার তীব্র স্বাদ ও ঘ্রাণের জন্য পরিচিত। “Ethnic Fermented Foods and Beverages of Bangladesh” গ্রন্থে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে গাঁজন করা মাছের ব্যবহার বহু পুরোনো ঐতিহ্য এবং এটি স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পাচ্ছে পাহাড়ি মরিচ ভর্তার সঙ্গে বিভিন্ন শাক সেদ্ধ। চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশ এই পদ তাদের প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারা ও সরল খাদ্যসংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। জুমচাষ কিংবা বনজ পরিবেশ থেকে সংগ্রহ করা নানা শাক সেদ্ধ করে ঝাল পাহাড়ি মরিচ ভর্তার সঙ্গে খাওয়ার এই সংস্কৃতি এখন বিশ্বব্যাপীও ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী খাবারের মধ্যে ‘বেম্বু চিকেন’ ও ‘বেম্বু ফিশ’ অন্যতম জনপ্রিয়। পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের রান্নার ঐতিহ্য থেকে আসা এই খাবারে কাঁচা বাঁশের ভেতরে মুরগি বা মাছ, পাহাড়ি মরিচ এবং স্থানীয় মসলা দিয়ে ধীরে ধীরে আগুনে রান্না করা হয়। বাঁশের প্রাকৃতিক সুগন্ধ খাবারে এনে দেয় অনন্য স্বাদ, যা পাহাড়ি খাদ্যসংস্কৃতির স্বকীয়তাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব আদিবাসী খাবার এখন বাঙালিদের মাঝেও জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ায় পাহাড়ি রেস্টুরেন্টগুলোতে এসব খাবারের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন শহরে গড়ে উঠেছে পাহাড়ি খাবারের বিশেষায়িত রেস্টুরেন্ট, যেখানে বেম্বু চিকেন, বেম্বু ফিশ, বাঁশ কোড়ল ভুনা, পাজন, পাহাড়ি মুরগি এবং নাপ্পিভিত্তিক নানা পদ পরিবেশন করা হয়। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে পাহাড়ি খাবারের প্রতি আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। পর্যটনের প্রসারের ফলে পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের কাছেও আরও পরিচিত হয়ে উঠছে।

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী খাদ্য কেবল পুষ্টির উৎস নয়; এটি সামাজিক সম্প্রীতি ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও বাহক। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর খাবার আজ মূলধারার মানুষের কাছেও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে, যা সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক ইতিবাচক।

Link copied!