রবিবার ০৫, এপ্রিল ২০২৬

রবিবার ০৫, এপ্রিল ২০২৬ -- : -- --

হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে উৎকন্ঠাজনক হারে  : ভয়াবহতা রোধে করণীয় 

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০২:৫১ এএম

হাম রোগের লক্ষণ ও ভয়াবহতা

দেশের বিভিন্ন জায়গায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে হাম। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন এলাকায় শিশুসহ বড়দের মাঝেও এই সংক্রমণ বেড়েছে, এমনকি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই জনগণের মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বিপুল পরিমাণে।
 বিশেষজ্ঞদের মতে, "আতঙ্ক নয়, বরং সঠিক তথ্য জানা এবং সচেতন থাকাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ।"

তাই, সকলের প্রয়োজন এই সংক্রামক রোগের ভাইরাস সম্বন্ধে  এবং এর প্রতিরোধে  সঠিক তথ্য জানা।

হাম কী এবং মুলত কাদের বেশি আক্রমন করে ?

"হাম" একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা রুবেলা বা (Rubella Viras) নামের ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়। এটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে ভাইরাস যা মূলত শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায় এবং শরীরে প্রবেশ করে লিম্ফ নোডে বংশবৃদ্ধি করে। এটি রক্তে ছড়িয়ে পড়ে ফুসকুড়ি, হালকা জ্বর, এবং লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়ার মতো উপসর্গ তৈরি করে। এটি দ্রুত সময়ের মধ্যে বাতাসে ছড়িয়ে পরতে পারে। 
এই ভাইরাস  মূলত শিশুদের আক্রান্ত করে। আক্রান্ত শিশুদের কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এই ভাইরাস। একবার সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করলে খুব দ্রুত তা আশপাশের অন্য শিশুদের মধ্যে ছড়িয়ে যেতে পারে।শিশুদের পাশাপাশি বয়স্কদেরও আক্রান্ত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে। 

হাম রোগের লক্ষণ ও ভয়াবহতা: 

হামের প্রাথমিক লক্ষণগুলো অনেকটা সাধারণ সর্দি-জ্বরের মতো। জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া। তবে কয়েকদিন পর শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দেয়, যা ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।এই লক্ষণগুলোর ২–৩ দিনের মধ্যে দেখা দিতে পারে ত্বকে লালচে র‍্যাশ, যা প্রথমে মুখে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

হাম মারাত্মকভাবে জনজীবনের কার্যক্রমে ব্যহত ঘটায়।তবে, সব ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক না হলেও কিছু ক্ষেত্রে এটি জটিল রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের জন্য ঝুঁকি বেশি।
 হামের জটিলতার মধ্যে রয়েছে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখের সংক্রমণ, এমনকি বিরল ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ। 
গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এই জটিলতাগুলোই অনেক সময় মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।হামে আক্রান্ত প্রতি ১,০০০ শিশুর মধ্যে এক থেকে তিনজন শ্বসনতন্ত্র ও স্নায়বিক জটিলতার কারণে মারা যায়। শ্বাসতন্ত্রে ভাইরাসের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত জটিলতাগুলোর মধ্যে রয়েছে ভাইরাল (জায়ান্ট-সেল) নিউমোনিয়া, নিউমোনাইটিস এবং ভাইরাল ল্যারিঙ্গোট্রাকিওব্রঙ্কাইটিস (ক্রুপ)।

শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে, গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ এটি গর্ভফুল বা প্ল্যাসেন্টা ভেদ করে ভ্রূণের কোষ ধ্বংস করতে পারে, যা কনজেনিটাল রুবেলা সিন্ড্রোম (CRS) সৃষ্টি করে।
 

এর ভয়াবহতা কমাতে করণীয় কি? 

হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা।এর প্রধান টিকার নাম এমএমআর (MMR) টিকা । এই টিকাটি হাম (Measles), মাম্পস (Mumps) এবং রুবেলা (Rubella) এই তিনটি রোগ থেকে সুরক্ষা দেয় । এছাড়া, হাম ও রুবেলার জন্য এমআর (MR) টিকাও ব্যবহার করা হয়।  বাংলাদেশে শিশুদের জন্য জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় বিনামূল্যে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হয়। এই টিকা শুধু শিশুকে সুরক্ষিত রাখে না, বরং পুরো সমাজকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে। কারণ বেশি সংখ্যক শিশু টিকা নিলে ভাইরাসের বিস্তার অনেকটাই কমে যায়।

জরুরী চিকিৎসা এবং যথাযথ পদক্ষেপ :

জ্বর খুব বেশি (১০২ ডিগ্রি বা তার বেশি) শ্বাস নিতে কষ্ট হলে বা শিশুর খাওয়ায় অনীহা বা বারবার বমি অতিরিক্ত দুর্বলতা বা অচেতনভাব হলে  র‍্যাশ দ্রুত ছড়িয়ে পরলে অবশ্যই অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরনাপন্ন হতে হবে। পরিবারের অন্য সদস্যদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। 
একজন আক্রান্ত হলে অন্যদের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই নিয়মিত হাত ধোয়া, আক্রান্ত শিশুর জিনিস আলাদা রাখা, ঘর পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখা, টিকা নেওয়া আছে কি না যাচাই করা -এসব বিষয় নিশ্চিত করতে হবে ।

আক্রান্ত রোগীকে পর্যাপ্ত তরল ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে । হামের সময় শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই পানি, স্যুপ, ডাবের পানি, নরম ও সহজপাচ্য খাবার, ভিটামিনসমৃদ্ধ ফলমূল খেতে দিতে হবে । এসব খাবার শিশুকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।

যেসব কাজে র‍য়েছে নিষেধাজ্ঞা :

গর্ভাবস্থায় হাম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, যা গর্ভপাত, অকাল প্রসব বা বাচ্চার ক্ষতি করতে পারে। এর কোনো সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। চিকিৎসকের পরামর্শে প্যারাসিটামল দিয়ে জ্বর নিয়ন্ত্রণ, প্রচুর তরল পান, বিশ্রাম এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সাপেোর্টিভ কেয়ার (সহায়ক চিকিৎসা) নেওয়া জরুরি। গর্ভাবস্থায় MMR টিকা দেওয়া নিষেধ।

এবং শিশুদের ক্ষেত্রে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা ও নিজে নিজে ওষুধ শুরু করা যাবে না। র‍্যাশে কোনো অজানা ক্রিম ব্যবহার করা যাবে না।

হামের নাম শুনলেই অনেক অভিভাবক ভয় পেয়ে যান। কিন্তু মনে রাখতে হবে সময়মতো সঠিক যত্ন ও চিকিৎসা নিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। শিশুর শরীরের ছোট ছোট পরিবর্তনগুলো লক্ষ্য করা, দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

এভাবেই, যথাযথ সচেতনতা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগের প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব। 

আব্দুল্লাহ আর রাফি, 
আইনবিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Link copied!