প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪৩ পিএম
দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পাঁচ শিক্ষার্থীর অস্বাভাবিক মৃত্যু শিক্ষাঙ্গনে গভীর শোক, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার আবহ তৈরি করেছে। রাজধানী ঢাকা থেকে কুমিল্লা ও বরিশাল পর্যন্ত বিস্তৃত এই ঘটনাগুলোতে আত্মহত্যার অভিযোগ, আকস্মিক অসুস্থতা এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপে ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র, পরিবার, সহপাঠী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যে প্রতিটি ঘটনার পেছনে আলাদা প্রেক্ষাপট থাকলেও শেষ পরিণতি একই নির্মম বাস্তবতায় এসে মিলেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী সাইদুল আমীন সীমান্তের মৃত্যু ঘটে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাজধানীর হাজারীবাগের মনেশ্বর রোডের একটি ভাড়া বাসায়। হাজারীবাগ থানার এসআই মো. জাহিদ হাসান জানান, বৃহস্পতিবার রাত দেড়টার দিকে সীমান্তকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, রাতে খবর পেয়ে তারা হাসপাতালে গিয়ে সীমান্তের মরদেহ পান এবং ঘটনার সময় তার আরেক রুমমেট বাইরে ছিলেন বলে জানতে পারেন। প্রাথমিকভাবে বিষপানে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে প্রকৃত কারণ জানা যাবে। সীমান্তের চাচা রুহুল আমিন জানান, রাত সাড়ে ১২টার দিকে তার এক বন্ধু বাইরে থেকে এসে দরজা বন্ধ পেয়ে অনেক ডাকাডাকি করেও সাড়া না পেয়ে তাকে ফোন দেন। পরে বাসায় গিয়ে দরজা ভেঙে সীমান্তকে বিছানায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের দাবি, সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপে ছিলেন। তার এক বোন মানসিক ভারসাম্যহীন এবং কোভিডের সময় মায়ের মৃত্যু তাকে ভেতরে ভেতরে ভেঙে দেয়, যা তাকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলেছিল।
এর কয়েক ঘণ্টা পর শুক্রবার সকালে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ৪৪তম আবর্তনের সাবেক শিক্ষার্থী সাবিত মাহমুদ শাওনের মরদেহ। তুরাগ থানার ডিউটি অফিসার এসআই ইখলাস মিয়া জানান, সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিক আলামতের ভিত্তিতে এটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিস্তারিত নিশ্চিত হওয়া যাবে। একই বিভাগের সহপাঠী মোহাম্মদ কাজল মিয়া জানান, সাবিত কয়েকদিন ধরেই মানসিকভাবে হতাশাগ্রস্ত ছিলেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্বাভাবিক কিছু পোস্টও দিয়েছিলেন। রাত আনুমানিক ৩টার দিকে জানা যায়, তিনি নিজ বাসায় আত্মহত্যা করেছেন। বাইরে থেকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরে ভেতরে যে তিনি ভেঙে পড়ছিলেন, তা তার সহপাঠীদের কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একই সময় কুমিল্লার সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী অর্পিতা নওশিনের মৃত্যুর ঘটনা শিক্ষাঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টি করে। সহপাঠীরা জানান, মানসিক যন্ত্রণায় তিনি ১০৯টি এভেন্ডার ৪০ মিলিগ্রাম ওষুধ সেবন করেছিলেন। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ওসি মোহাম্মদ সিরাজুল মোস্তফা জানান, খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়েছে এবং বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। নওশিন খুলনা সদরের বাসিন্দা এবং এক ভাই এক বোনের মধ্যে ছোট ছিলেন। খুলনার সরকারি করোনেশন গার্লস হাই স্কুল থেকে এসএসসি এবং খুলনা কলেজিয়েট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কেসিসি উইমেন কলেজ থেকে এইচএসসি শেষে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হন এই মেডিকেল কলেজে। কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার আগেই নিথর দেহ হয়ে ফিরতে হলো তাকে। সহপাঠীরা জানান, প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষায় সব বিষয়ে উত্তীর্ণ হলেও এনাটমিতে ফেল করার পর গত তিন বছরে আরও চারবার পরীক্ষা দিয়েও তিনি উত্তীর্ণ হতে পারেননি। তাদের দাবি, একাডেমিক চাপ এবং বারবার ব্যর্থতা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। নওশিনের ভাই শাহরিয়ার আরমান অভিযোগ করেন, তার বোনকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ দেওয়া হয়েছে এবং সেটিই এই পরিণতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। তিনি জানান, মৃত্যুর আগের দিনও ফর্ম ফিলআপ নিয়ে তার সঙ্গে কথা হয়েছিল এবং এমন ঘটনার কোনো পূর্বাভাস তারা পাননি।
অন্যদিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সাবরী মাহি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর হাসপাতালে ভর্তি হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। সহপাঠীরা জানান, তিনি ডায়রিয়াজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। তার মৃত্যুতে সহপাঠীদের মধ্যে শোক নেমে আসে। এক সহপাঠী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্মৃতিচারণ করে জানান, মুগদা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই তাদের বন্ধুত্ব, পরে মাইগ্রেশনের কারণে আলাদা হলেও যোগাযোগ কখনো বন্ধ হয়নি। তার মৃত্যু যেন হঠাৎ করেই সবাইকে স্তব্ধ করে দেয়।
একই দিনে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজ আহমেদ নাফিজ নিজ বাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে নেওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয়। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে তার মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকদের ধারণা। সহপাঠীরা তাকে একজন প্রাণবন্ত, হাসিখুশি ও মিশুক মানুষ হিসেবে স্মরণ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের শোকবার্তায় বারবার উঠে এসেছে নাফিজের প্রাণচাঞ্চল্য এবং বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের কথা।
এই পাঁচটি ঘটনার মধ্যে তিনটিতে আত্মহত্যার প্রাথমিক আলামত পাওয়া গেছে এবং দুটি ক্ষেত্রে অসুস্থতাজনিত মৃত্যু ঘটেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। তবে প্রতিটি ঘটনাই এখনো তদন্তাধীন।
