বৃহস্পতিবার ০২, এপ্রিল ২০২৬

বৃহস্পতিবার ০২, এপ্রিল ২০২৬ -- : -- --

নীল আলো জ্বলে, বাস্তবতা বদলায় না

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৪৮ পিএম

লেখক: মোঃ তায়ীম খান 

রাজশাহীর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সাত বছরের রাফি কথা বলতে পারে না, কিন্তু ছবি আঁকে অসাধারণ। তার মা তিন মাস ধরে স্কুলে ঘুরছেন ভর্তির জন্য। প্রতিবার একটাই উত্তর "আমাদের এখানে ব্যবস্থা নেই।" ব্যবস্থা নেই মানে শিক্ষক নেই, প্রশিক্ষণ নেই, ইচ্ছাও নেই। রাফির মা ফিরে আসেন, পরদিন আবার যান। এই লড়াইয়ের কোনো দিবস নেই, কোনো নীল আলো নেই।

প্রতি বছর ২ এপ্রিল এলে একটা নির্দিষ্ট ছবি তৈরি হয়। বড় বড় সরকারি ভবনে নীল আলো জ্বলে ওঠে, পত্রিকায় বিশেষ ক্রোড়পত্র বের হয়, সেমিনারে বক্তারা গলা উঁচু করে বলেন "অটিজম কোনো অভিশাপ নয়।" তারপর রাত পোহালেই সব শেষ। পরদিন থেকে আবার সেই পুরনো বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে অটিজম নিয়ে সচেতনতা বেড়েছে, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সচেতনতা আর গ্রহণযোগ্যতা এক জিনিস নয়। শহরের শিক্ষিত পরিবারও যখন অটিস্টিক সন্তানের বিষয়টা আত্মীয়দের কাছ থেকে গোপন রাখে, তখন বোঝা যায় জ্ঞান এসেছে, কিন্তু মানসিকতা বদলায়নি।

গ্রামাঞ্চলের চিত্র আরও কঠিন। সেখানে অটিজমকে এখনো অনেকে "জিনের আছর" বলে মনে করেন। কবিরাজের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, ঝাড়ফুঁক করানো হয়। শিশুটি চিকিৎসা পায় না, থেরাপি পায় না পায় শুধু বিলম্ব। আর প্রতিটি বিলম্ব তার বিকাশের সম্ভাবনাকে আরও সংকুচিত করে দেয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন, অটিজমে আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে প্রথম পাঁচ বছর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়ে সঠিক থেরাপি না পেলে পরবর্তী জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়ে। কুসংস্কারের কারণে সেই সোনালি সময়টা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন।

"বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (BMU) জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি হাজারে প্রায় দুইজন শিশু অটিজম স্পেকট্রামে রয়েছে এবং শহরাঞ্চলে এই হার গ্রামের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।"

অটিস্টিক শিশুদের কল্যাণ ফাউন্ডেশনের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় তিন লাখ শিশু অটিজম স্পেকট্রামে রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সহায়তায় পরিচালিত একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০,০০০ শিশুর মধ্যে ১৭ জন অটিজম স্পেকট্রামে আছে শহরে এই হার গ্রামের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অথচ সরকারি বিশেষ বিদ্যালয়ের সংখ্যা মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি, বেশিরভাগই ঢাকাকেন্দ্রিক। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অটিজম সেবা কার্যত অনুপস্থিত গ্রামীণ ও আধা-শহুরে জনগোষ্ঠী সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে। বেসরকারি থেরাপি সেন্টারে মাসিক খরচ পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা যা সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে।
এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়, এগুলো একেকটা পরিবারের পরাজয়ের গল্প।

অটিজম আক্রান্ত পরিবারের একাকীত্ব  কেউ বুঝে না আর কেউ বোঝার চেষ্টাও করে না।

একটি অটিস্টিক শিশুর পরিবার কেমন জীবন যাপন করে, সেটা বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। মায়েরা প্রায়ই চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। বাবারা অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে গিয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তার ওপর সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি তো আছেই আত্মীয়রা পরামর্শ দেন, প্রতিবেশীরা ফিসফিস করেন, কেউ কেউ সরাসরি বলেন "আগের জন্মে কী পাপ করেছিলে?" এই কথাগুলো শুনতে হয় বারবার, একই পরিবারকে, একই মায়ের কানে।

এই একাকীত্বটা কলামের পাতায় লেখা যায়, কিন্তু সত্যিকার অর্থে অনুভব করতে হলে ওই পরিবারের পাশে একটু দাঁড়াতে হয়।

রাষ্ট্র কোথায় দাঁড়িয়ে?
বাংলাদেশে ২০১১ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন পাস হয়েছে। অটিজম নিয়ে জাতীয় কমিটি আছে, নীতিমালা আছে। কিন্তু আইন আর বাস্তবতার মাঝখানে যে বিশাল ফাঁকটা সেটা পূরণ হয়নি আজও। সরকারি হাসপাতালে অটিজম বিশেষজ্ঞ নেই বললেই চলে, থেরাপিস্টের সংখ্যা এতটাই কম যে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।

প্রতি বছর সরকারি অনুষ্ঠানে "অটিজম বান্ধব বাংলাদেশ" গড়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু প্রতিশ্রুতি আর বাজেট বরাদ্দ এক নয়। ভবনে নীল আলো জ্বালানোর খরচ আছে, কিন্তু জেলায় জেলায় থেরাপি সেন্টার খোলার উদ্যোগ নেই এই স্ববিরোধিতাই বলে দেয় রাষ্ট্র কতটা সিরিয়াস।

অটিজম সচেতনতা মানে শুধু এই শব্দটা জানা নয়। সচেতনতা মানে পাড়ার অটিস্টিক ছেলেটাকে দেখলে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা, তার মাকে "কেমন আছেন" জিজ্ঞেস করা। সচেতনতা মানে স্কুলশিক্ষকের প্রশিক্ষণ থাকা, নিয়োগকর্তার বোঝা যে একজন অটিস্টিক মানুষ কর্মক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রাখতে পারেন।

সবচেয়ে বড় কথা অটিস্টিক মানুষেরা সমাজের বোঝা নন, তারা ভিন্নভাবে কার্যকর মানুষ। তাদের দরকার করুণা নয়, দরকার অধিকার। শিক্ষার অধিকার, চিকিৎসার অধিকার, মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার অধিকার।

২ এপ্রিল চলে যাবে। নীল আলো নিভে যাবে। কিন্তু রাফির মা পরদিনও সেই স্কুলের গেটে যাবেন। রাষ্ট্রকে, সমাজকে এবং আমাদের প্রত্যেককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি শুধু আলো জ্বালাব, নাকি সেই মায়ের লড়াইটা একটু সহজ করব? সচেতনতা দিবস তখনই অর্থবহ হবে, যেদিন রাফির মতো একটি শিশুকে স্কুলের গেটে ফিরে আসতে হবে না।

 

লেখক
নাম: মোঃ তায়ীম খান 
শিক্ষার্থী অর্থনীতি বিভাগ।
শিক্ষাবর্ষ:২০২৪-২০২৫
গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

Link copied!