রবিবার ০৫, এপ্রিল ২০২৬

রবিবার ০৫, এপ্রিল ২০২৬ -- : -- --

রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রযুক্তির অভাব: কেন প্রয়োজন প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১০ পিএম

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ সম্ভাবনাময় একটি দেশ, বিশেষত প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে এই সম্ভাবনা বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খাতে প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ এখনো কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। দীর্ঘদিন প্রশাসনিক বিভিন্ন স্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, প্রযুক্তিকে গ্রহণে একধরনের অনীহা এখনো বিদ্যমান।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি কিংবা জ্বালানি—প্রতিটি খাতে প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগ মানুষের জীবনমান পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এই বিশ্বাস এখনো দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

বাংলাদেশের অন্যতম শক্তি তার তরুণ জনগোষ্ঠী। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যেখানে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপে রয়েছে, সেখানে বাংলাদেশে কর্মক্ষম তরুণদের আধিক্য একটি বড় সুবিধা। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা যাচ্ছে না।

বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অটোমেশন দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এর ফলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হলেও কিছু প্রচলিত কাজ হারিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনার পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাও পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এই সিস্টেম ব্যবহার করে মোবাইল সিম নিবন্ধন, ব্যাংকিং খাতে গ্রাহক যাচাইকরণ (কেওয়াইসি) এবং কোভিড-১৯ টিকাদান কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। তবে এই সফলতার পরও এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো হয়নি।

প্রযুক্তির মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করা এবং সঠিকভাবে সরকারি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। মোবাইল ডেটা বিশ্লেষণ বা মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে প্রকৃত দরিদ্রদের শনাক্ত করা সম্ভব হলেও এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নে পর্যাপ্ত আগ্রহ দেখা যায়নি।

বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা কার্ড চালুর আলোচনা থাকলেও, সেগুলোর কার্যকারিতা অনেকাংশে নির্ভর করছে একটি সমন্বিত ও নির্ভুল জাতীয় ডাটাবেজের ওপর। এই সমন্বয়হীনতা ভবিষ্যতে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

একইভাবে, একটি একীভূত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জ্বালানি, খাদ্য বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা বিতরণ করা সম্ভব হলেও বাস্তবে এমন উদ্যোগ এখনো গ্রহণ করা হয়নি। দেশের ভেতরেই দক্ষ সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা প্রশ্নের জন্ম দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় যে ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রযুক্তি নেতৃত্বের অভাব। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় নিজস্ব উদ্যোগে কাজ করলেও তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রযুক্তি ব্যবস্থার কোনো একক দায়িত্বশীল নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশের একজন প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা পেতে আর কত বছর অপেক্ষা করতে হবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। তবে এটুকু জানি, যত দেরি হবে; তত বেশি সম্ভাবনা নষ্ট হবে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছে।

প্রযুক্তিনির্ভর রাষ্ট্র গঠনে কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবি। অন্যথায়, দক্ষ মানবসম্পদ বিদেশমুখী হবে এবং দেশ মেধাপাচারের ঝুঁকিতে পড়বে।

Link copied!