প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪১ পিএম
উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থা, আধুনিক গবেষণা সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশের কারণে জাপান বর্তমানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে উচ্চশিক্ষার অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। প্রতি বছর হাজারো শিক্ষার্থী স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও গবেষণার জন্য জাপানে পাড়ি জমান। তবে অনেকেই মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত হলেই জাপানে যাওয়ার পথ সহজ হয়ে যায়। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়।
জাপানে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার্থী হিসেবে যেতে হলে ভর্তি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ইমিগ্রেশন, ভিসা, আর্থিক সক্ষমতা ও স্থানীয় নিবন্ধনসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। জাপান সরকারের ‘স্টাডি ইন জাপান’ প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, এসব নিয়ম সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা থাকলে আবেদন ও যাত্রাপথ অনেক সহজ হয়ে যায়।
যোগ্যতার সনদ (COE) কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
জাপানে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথিগুলোর একটি হলো Certificate of Eligibility (COE) বা যোগ্যতার সনদ। এটি মূলত জাপানের ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের দেওয়া একটি অনুমোদনপত্র, যা প্রমাণ করে যে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষার্থী হিসেবে জাপানে অবস্থানের যোগ্য।
সাধারণত শিক্ষার্থী যে বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন, সেই প্রতিষ্ঠানই শিক্ষার্থীর পক্ষে স্থানীয় ইমিগ্রেশন অফিসে COE-এর আবেদন করে। এই সনদ ছাড়া শিক্ষার্থী ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া অনেক ক্ষেত্রে জটিল হয়ে যেতে পারে।
আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ দেখানো বাধ্যতামূলক
জাপান সরকার নিশ্চিত হতে চায় যে বিদেশি শিক্ষার্থী সেখানে অবস্থানকালে নিজের শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বহন করতে সক্ষম হবে। এ কারণে আবেদনকারীদের আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ জমা দিতে হয়।
এ ক্ষেত্রে সাধারণত প্রয়োজন হতে পারে
> ব্যাংক সঞ্চয়পত্র বা ব্যাংক স্টেটমেন্ট
> আয় সনদ
> অর্থের উৎসসংক্রান্ত নথি
> স্পনসরের আর্থিক কাগজপত্র (যদি অন্য কেউ খরচ বহন করেন)
শিক্ষার্থী নিজে অথবা তার অভিভাবকের নামে এসব নথি জমা দেওয়া যেতে পারে।
শিক্ষার্থী ভিসার জন্য যেসব কাগজপত্র প্রয়োজন
COE পাওয়ার পর শিক্ষার্থীরা নিজ দেশের জাপানি দূতাবাস বা কনস্যুলেটে শিক্ষার্থী ভিসার জন্য আবেদন করতে পারেন।সাধারণত প্রয়োজন হয়,
- বৈধ পাসপোর্ট
- পূরণকৃত ভিসা আবেদন ফরম
- পাসপোর্ট সাইজ ছবি
- Certificate of Eligibility (COE)
- প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত সহায়ক নথি
ভিসা অনুমোদনের পর শিক্ষার্থী জাপানে প্রবেশের অনুমতি পাবেন।
রেসিডেন্স কার্ড: জাপানে পরিচয়ের প্রধান নথি
তিন মাসের বেশি সময় জাপানে অবস্থানকারী আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য রেসিডেন্স কার্ড (Zairyu Card) বাধ্যতামূলক। এই কার্ডে শিক্ষার্থীর পরিচয়, ভিসার ধরন ও অবস্থানের মেয়াদ উল্লেখ থাকে। জাপানে অবস্থানকালে সব সময় এই কার্ড সঙ্গে রাখা প্রয়োজন।
বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে জাপানে প্রবেশ করলে অনেক সময় ইমিগ্রেশন ক্লিয়ারেন্সের সময়ই রেসিডেন্স কার্ড দেওয়া হয়। অন্য ক্ষেত্রে স্থানীয় নিবন্ধন সম্পন্ন করার পর এটি সংগ্রহ করতে হয়।
১৪ দিনের মধ্যে ঠিকানা নিবন্ধন করতে হবে
জাপানে আবাসন নিশ্চিত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের ১৪ দিনের মধ্যে স্থানীয় পৌরসভা বা সিটি অফিসে গিয়ে নিজের ঠিকানা নিবন্ধন করতে হয়।এটি জাপানের একটি বাধ্যতামূলক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিবন্ধন না করলে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
My Number কী এবং কেন প্রয়োজন?
জাপানে অবস্থানকারী প্রত্যেক বিদেশিকে একটি ১২ সংখ্যার ব্যক্তিগত পরিচয় নম্বর দেওয়া হয়, যা My Number নামে পরিচিত। এই নম্বর ব্যবহৃত হয়,
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে
- কর (Tax) সংক্রান্ত কাজে
- সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায়
- খণ্ডকালীন চাকরির নথিপত্রে
- বিভিন্ন সরকারি সেবায়
স্থানীয় নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর এই নম্বর ইস্যু করা হয়।
ভর্তি পরীক্ষা দিতে গেলে কী ধরনের ভিসা লাগবে?
যেসব শিক্ষার্থী শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে জাপান যেতে চান, তাদের শিক্ষার্থী ভিসা নয়, Temporary Visitor Visa নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া পরীক্ষার ভাউচার বা আমন্ত্রণপত্র দেখাতে হতে পারে। ভিসার ধরন ও আবেদনকারীর জাতীয়তার ভিত্তিতে সাধারণত ১৫, ৩০ অথবা ৯০ দিন পর্যন্ত জাপানে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়।
কেন আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাপানে পড়াশোনার ক্ষেত্রে শুধু ভর্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়। ভিসা, আর্থিক নথি, COE, রেসিডেন্স কার্ড ও স্থানীয় নিবন্ধন-প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে আগে থেকেই পরিষ্কার ধারণা থাকলে আবেদন প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং অপ্রত্যাশিত জটিলতা এড়ানো সম্ভব হয়।
জাপানে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে চাইলে তাই বিশ্ববিদ্যালয় নির্বাচনের পাশাপাশি এসব প্রশাসনিক নিয়ম সম্পর্কেও সময়মতো প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
