প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা সম্পদ হারিয়েছেন, কেউ অসুস্থতায় ভুগেছেন, আবার কেউ প্রিয়জন হারানোর বেদনা সহ্য করেছেন। কিন্তু এমন একজন নবী ছিলেন, যিনি কঠিন পরীক্ষা, অসুস্থতা ও ক্ষতির মধ্যেও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস অটুট রেখেছিলেন। তিনি হলেন হজরত আইয়ুব (আ.)।
কোরআনে তাঁর জীবন থেকে ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি আস্থার অসাধারণ শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। তাঁর কাহিনী শুধু অতীতের একটি ঘটনা নয়; আজও অসুস্থতা, দুঃখ, আর্থিক সংকট ও প্রিয়জন হারানোর কষ্টে থাকা মানুষের জন্য এটি গভীর আশার উৎস।
হজরত আইয়ুব (আ.) কে ছিলেন
হজরত আইয়ুব (আ.) ছিলেন আল্লাহর একজন নবী। কোরআনের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। তাঁর জীবন ছিল আল্লাহর আনুগত্য ও ধৈর্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ইসলামী ঐতিহাসিক বিভিন্ন বর্ণনায় তাঁর সম্পদ, পরিবার ও সমৃদ্ধ জীবনের কথা পাওয়া যায়। তবে এসব বর্ণনার সবকিছু সমানভাবে নির্ভরযোগ্য নয়। কোরআন ও নির্ভরযোগ্য হাদিসে যতটুকু বর্ণিত হয়েছে, সেটিই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ভিত্তি।
প্রাচুর্য থেকে কঠিন পরীক্ষার পথে
আইয়ুব (আ.) আল্লাহর নিয়ামতপ্রাপ্ত বান্দা ছিলেন। এরপর তাঁর জীবনে একের পর এক কঠিন পরীক্ষা আসে।তিনি সম্পদ ও বিভিন্ন নিয়ামত হারান। তাঁর জীবনে এমন বিপর্যয় নেমে আসে, যা একজন মানুষের জন্য অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু এসব ক্ষতির পরও তাঁর ঈমান দুর্বল হয়নি।
তিনি জানতেন, দুনিয়ার সব সম্পদ মানুষের স্থায়ী মালিকানা নয়। আল্লাহ যাকে যা দিয়েছেন, তা তাঁরই দেওয়া আমানত।
সন্তান হারানোর বেদনা
ইসলামী ঐতিহাসিক বর্ণনায় আইয়ুব (আ.)-এর সন্তানদের হারানোর কথাও পাওয়া যায়। তবে সন্তানদের মৃত্যুর বিস্তারিত বিবরণ কোরআনে নেই। একজন পিতার জন্য সন্তান হারানোর কষ্ট কতটা গভীর, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। তবুও আইয়ুব (আ.) আল্লাহর ওপর আস্থা হারাননি।
এই জায়গাতেই তাঁর ধৈর্যের প্রকৃত পরিচয় ফুটে ওঠে।
দীর্ঘ অসুস্থতার কঠিন পরীক্ষা
সম্পদ ও পরিবারের পরীক্ষার পাশাপাশি আইয়ুব (আ.) কঠিন অসুস্থতার মধ্যেও পড়েন। কোরআনে তাঁর নিজের বক্তব্য এসেছে: “নিশ্চয়ই আমি কষ্টে আক্রান্ত হয়েছি এবং আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু।”সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৩
আর সূরা সোয়াদে তাঁর বক্তব্য এসেছে:“শয়তান আমাকে কষ্ট ও যন্ত্রণায় আক্রান্ত করেছে।”সূরা সোয়াদ, আয়াত ৪১
তবে কোরআন তাঁর রোগের নির্দিষ্ট নাম বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্তারিত বর্ণনা দেয়নি। তাই প্রচলিত অনেক গল্পে যে রোগের অতিরিক্ত বিবরণ পাওয়া যায়, সেগুলোকে নিশ্চিত কোরআনি তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
মানুষের দূরে সরে যাওয়ার সময়
দীর্ঘ অসুস্থতা একজন মানুষকে শুধু শারীরিকভাবে নয়, সামাজিকভাবেও একা করে দিতে পারে। আইয়ুব (আ.)-এর পরীক্ষার সময়ও তাঁর জীবনে কঠিন নিঃসঙ্গতা এসেছিল। কিন্তু মানুষের সঙ্গ কমে গেলেও তাঁর সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক কখনো দুর্বল হয়নি।
এটাই তাঁর কাহিনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। মানুষ যখন পাশে থাকে না, তখনও আল্লাহ বান্দার কাছ থেকে দূরে নন। সেই সময় পাশে ছিলেন তাঁর স্ত্রী । আইয়ুব (আ.)-এর স্ত্রী সম্পর্কে বিভিন্ন ইসলামী ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায়। তাঁর সেবার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে তাঁর স্ত্রীর নাম, বিস্তারিত ঘটনা কিংবা কিছু প্রচলিত কাহিনীর বিষয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। তাই সংবাদ বা ফিচারে সেগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে না লেখাই উত্তম।
নিশ্চিত বিষয় হলো, আইয়ুব (আ.) কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ছিলেন এবং আল্লাহ তাঁর ধৈর্যের প্রশংসা করেছেন।
অভিযোগ নয়, ছিল আল্লাহর কাছে বিনীত প্রার্থনা
আইয়ুব (আ.)-এর কাহিনীর সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অংশ হলো তাঁর দোয়া। তিনি আল্লাহর কাছে বলেছিলেন:“হে আমার রব, আমি কষ্টে আক্রান্ত হয়েছি এবং আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু।” সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৩
এই দোয়ায় লক্ষ করার মতো বিষয় হলো, তিনি আল্লাহর কাছে নিজের কষ্টের কথা বলেছেন, কিন্তু আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। তিনি নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন এবং আল্লাহর দয়ার ওপর নির্ভর করেছেন।
আল্লাহর সাহায্য এলো
আইয়ুব (আ.)-এর দোয়ার পর আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত করেন। আল্লাহ বলেন, “তুমি তোমার পা দিয়ে আঘাত করো। এটি গোসলের জন্য ঠান্ডা পানি এবং পান করার জন্য।” সূরা সোয়াদ, আয়াত ৪২
এরপর আল্লাহ তাঁর কষ্ট দূর করে দেন। কোরআনে বলা হয়েছে: “অতঃপর আমি তার দোয়া কবুল করলাম এবং তার যে দুঃখ-কষ্ট ছিল তা দূর করে দিলাম।” সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৪
আল্লাহ ফিরিয়ে দিলেন পরিবার ও নিয়ামত
আল্লাহ শুধু তাঁর অসুস্থতা দূর করেননি। তাঁর ওপর নিজের রহমতও পূর্ণ করেছেন। কোরআনে এসেছে: “আমি তাকে তার পরিবার ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সঙ্গে আরও সমপরিমাণ বাড়িয়ে দিলাম, আমার পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ এবং ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ।” সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত ৮৪
অর্থাৎ, যে মানুষটি কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে দেন।
আল্লাহর কাছে আইয়ুব (আ.)-এর মর্যাদা
হজরত আইয়ুব (আ.) সম্পর্কে কোরআনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা হলো: “নিশ্চয়ই আমি তাকে ধৈর্যশীল পেয়েছি। কতই না উত্তম বান্দা! নিশ্চয়ই সে ছিল আল্লাহমুখী। ” সূরা সোয়াদ, আয়াত ৪৪
একজন বান্দার জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে যে, আল্লাহ নিজেই তাঁর ধৈর্যের প্রশংসা করেছেন।
আইয়ুব (আ.) থেকে আমাদের শিক্ষা
- আইয়ুব (আ.)-এর জীবন আমাদের শেখায়, বিপদ এলেই আল্লাহর প্রতি অভিযোগ করা উচিত নয়। বরং নিজের কষ্ট নিয়ে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে।
- অসুস্থতা এলে ধৈর্য ধরতে হবে।
- সম্পদ হারালে আল্লাহর ওপর আস্থা রাখতে হবে।
- প্রিয়জন হারালে আল্লাহর কাছে সান্ত্বনা চাইতে হবে।
- দীর্ঘদিন দোয়ার ফল না পেলেও হতাশ হওয়া যাবে না।
- আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, মানুষের অবস্থা যত কঠিনই হোক, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না।
আজ কেউ হয়তো দীর্ঘদিন অসুস্থ। কেউ ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত। কেউ চাকরি হারিয়েছেন। কেউ প্রিয়জন হারানোর শোকে কাতর। আবার কেউ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।
তাঁদের প্রত্যেকের জন্য আইয়ুব (আ.)-এর জীবন একটি বার্তা বহন করে। কষ্ট আসতে পারে, কিন্তু কষ্ট চিরস্থায়ী নয়। মানুষ দূরে সরে যেতে পারে, কিন্তু আল্লাহ দূরে সরে যান না। দোয়ার উত্তর পেতে সময় লাগতে পারে, কিন্তু আল্লাহ বান্দার দোয়া সম্পর্কে অবগত।
আর ধৈর্য মানে কষ্ট না পাওয়া নয়। ধৈর্য হলো কষ্টের মধ্যেও আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ধরে রাখা।
শেষ কথা
হজরত আইয়ুব (আ.)-এর কাহিনী শুধু ধৈর্যের গল্প নয়। এটি একজন বান্দার সঙ্গে তাঁর রবের সম্পর্কের গল্প। সম্পদ হারিয়েছেন, কিন্তু ঈমান হারাননি। কষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। দীর্ঘ পরীক্ষা এসেছে, কিন্তু আল্লাহর দিকে ফিরে থাকা ছেড়ে দেননি। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাঁর কষ্ট দূর করেছেন এবং তাঁকে আবার নিয়ামত দান করেছেন।
তাই জীবনের কঠিন সময়ে আইয়ুব (আ.)-এর দোয়াটি স্মরণ করা যায়:
“রব্বি আন্নি মাস্সানিয়াদ দুররু ওয়া আনতা আরহামুর রাহিমীন।”অর্থ: “হে আমার রব, আমি কষ্টে আক্রান্ত হয়েছি এবং আপনি তো দয়ালুদের মধ্যে সর্বাধিক দয়ালু।”
