শনিবার ২৬, সেপ্টেম্বর ২০২৬

শনিবার ২৬, সেপ্টেম্বর ২০২৬ -- : -- --

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের 'মিডিয়া লিটারেসি' জানা জরুরি

মোঃ আয়নুল ইসলাম

প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৫৪ পিএম

ছবি | ক্যাম্পাস রিপোর্ট

মোঃ আয়নুল ইসলাম: ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা বিপুল পরিমাণ তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হলেও ভুয়া খবর, ডিপফেক, ক্লিকবেইট, প্রোপাগান্ডা ও অ্যালগরিদম-নির্ভর তথ্যপ্রবাহ তাদের চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। এই প্রবন্ধে মিডিয়া লিটারেসির ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য এর গুরুত্ব এবং ভুল তথ্য শনাক্তের ব্যবহারিক কৌশল তুলে ধরা হয়েছে। প্রবন্ধে ইউনেস্কোর মিডিয়া ও তথ্যসাক্ষরতা কাঠামো এবং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভুয়া খবর বিস্তার নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণার তথ্য যুক্ত করা হয়েছে।
 
স্মার্টফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপের বিস্তারের ফলে তথ্য পাওয়া এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ। কিন্তু তথ্যের সহজলভ্যতা তার সত্যতা নিশ্চিত করে না। একই প্ল্যাটফর্মে নির্ভরযোগ্য সংবাদ, মতামত, বিজ্ঞাপন, গুজব ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়ছে।
 
বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় একজন শিক্ষার্থীর বুদ্ধিবৃত্তিক ও নাগরিক পরিচয় গঠনের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে শিক্ষার্থীদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও পেশাগত বিষয়ে ধারণা তৈরি হয়। ফলে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রভাব তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক পরিসরেও পড়তে পারে। এমন বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে মিডিয়া লিটারেসি জানা জরুরী।
 
মিডিয়া লিটারেসি কী?
 
মিডিয়া লিটারেসি বা গণমাধ্যম সাক্ষরতা হলো বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য বা বার্তাগুলো বুদ্ধিমত্তা ও বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল্যায়ন, গ্রহণ এবং নিজেরাও দায়িত্বশীলভাবে মিডিয়া কন্টেন্ট তৈরি করার দক্ষতা। ইউনেস্কোর মতে, মিডিয়া সাক্ষরতা মানুষকে তথ্যের সত্যতা, মূল্য, প্রাসঙ্গিকতা ও উদ্দেশ্য বিশ্লেষণ করে দায়িত্বশীলভাবে ডিজিটাল পরিবেশে অংশ নিতে সক্ষম করে।
 
এই দক্ষতার মধ্যে রয়েছে; তথ্যের উৎস শনাক্ত করা, লেখক বা প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করা, কনটেন্টের উদ্দেশ্য ও পক্ষপাত বিশ্লেষণ করা,  প্রমাণ, তারিখ ও প্রেক্ষাপট পরীক্ষা করা, ভিন্ন উৎস ও মতামতের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা.যাচাই ছাড়া কোনো কনটেন্ট শেয়ার না করা ইত্যাদি।
 
বর্তমানে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তথ্যের পরিমাণ অত্যধিক হওয়ায় ব্যবহারকারীরা অনেক সময় দ্রুত ও অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর নির্ভর করেন। এতে মনোযোগ কমে এবং গভীরভাবে যাচাই করার প্রবণতা দুর্বল হয়। চটকদার শিরোনাম, অতিরঞ্জিত দাবি ও সংক্ষিপ্ত ভিডিও ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করে। পুরো প্রতিবেদন না পড়ে শুধু শিরোনাম বা পোস্ট দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভুল তথ্যের বিস্তার বাড়ায়। এছাড়াও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে বাস্তবসম্মত ভুয়া ছবি, ভিডিও ও অডিও তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে দৃশ্যমান বা শ্রাব্য কোনো কনটেন্টকে যাচাই ছাড়া সত্য ধরে নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।
 
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর আগের পছন্দের ভিত্তিতে কনটেন্ট সাজায়। এতে মানুষ একই ধরনের মতামতের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে সরে যায়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, একাডেমিক গবেষণা, ক্যারিয়ার, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সব ক্ষেত্রেই নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন। ভুল তথ্য শিক্ষার্থীদের ভুল সিদ্ধান্তের দিকে নিতে পারে। তাই তথ্য গ্রহণের পূর্বে উৎস যাচাই, লেখকের পরিচয় পরীক্ষা এবং তথ্যের প্রমাণ বিশ্লেষণ করা শিক্ষার্থীদের সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করবে।
 
এছাড়াও, মিডিয়া লিটারেসি শিক্ষার্থীদের ভিন্ন মত শুনতে, প্রমাণভিত্তিক তথ্য গ্রহণে এবং আবেগনির্ভর প্রচারণা থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সঙ্গে তথ্য যাচাইয়ের সম্পর্ক দুর্বল; নিজের মতামতের সঙ্গে মিলে যায় এমন তথ্য শেয়ার করার প্রবণতা ভুল তথ্য ছড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ কারণ। 
 
কীভাবে মিডিয়া লিটারেসি অর্জন করবেন?
 
১. উৎস যাচাই করুন
২. ওয়েবসাইট বা পেজটির পরিচয়, লেখকের নাম, প্রকাশের তারিখ, সম্পাদকীয় নীতি এবং আগের প্রতিবেদন পরীক্ষা করুন।
৩. একাধিক উৎসে মিলিয়ে দেখুন
৪. চাঞ্চল্যকর কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম ও ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্মে তা যাচাই করুন।
৫. পুরো প্রতিবেদন পড়ুন, শুধু শিরোনাম বা পোস্টের অংশবিশেষ দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। পুরো প্রতিবেদন, প্রেক্ষাপট, সূত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পড়ুন।
৬. ছবি ও ভিডিও যাচাই করুন, ছবি বা ভিডিওটি পুরোনো কি না, অন্য কোনো ঘটনার সঙ্গে যুক্ত কি না এবং সম্পাদিত হয়েছে কি না তা যাচাই করুন। প্রয়োজনে রিভার্স ইমেজ সার্চ ও মূল উৎস খুঁজে দেখুন।
৭. আবেগনির্ভর কনটেন্টে সতর্ক থাকুন; যে কনটেন্ট অতিরিক্ত রাগ, ভয়, ঘৃণা বা উত্তেজনা তৈরি করে, তা দ্রুত শেয়ার না করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন। আবেগকে কাজে লাগিয়ে ভাইরাল হওয়ার মতো কনটেন্টে প্রায়ই তথ্যের ঘাটতি থাকে।
৮. শেয়ার করার আগে থামুন। তথ্যটি সত্য কি না, তা শেয়ার করলে নিরীহ কারও ক্ষতি হতে পারে কি না এবং তথ্যটির সামাজিক প্রভাব কী? এই তিনটি প্রশ্ন নিজেকে করুন।
 
শিক্ষার্থীদের মিডিয়া লিটারেসি বৃদ্ধিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের করণীয়
 
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মিডিয়া লিটারেসিকে শুধু গণযোগাযোগ বা সাংবাদিকতা বিভাগের বিষয় হিসেবে না দেখে সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। এজন্য—ওরিয়েন্টেশন ও সাধারণ শিক্ষা কোর্সে মিডিয়া লিটারেসি অন্তর্ভুক্ত করা, ফ্যাক্ট-চেকিং ও ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে কর্মশালা আয়োজন করা,  ডিপফেক, সাইবার বুলিং ও ঘৃণাত্মক বক্তব্য সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া, লাইব্রেরিতে নির্ভরযোগ্য ডেটাবেস ব্যবহারের দক্ষতা তৈরি করা ও শিক্ষার্থীদের যাচাইভিত্তিক সংবাদ ও গবেষণা প্রকল্পে যুক্ত করা প্রয়োজন।
 
ডিজিটাল যুগে শুধু তথ্য পাওয়া যথেষ্ট নয়, তথ্যের সত্যতা, উদ্দেশ্য ও প্রভাব বোঝার সক্ষমতাই প্রকৃত শক্তি। মিডিয়া লিটারেসি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের শুধু ভুয়া খবর শনাক্ত করতে সাহায্য করে না, বরং তাদের আরও দায়িত্বশীল গবেষক, সচেতন নাগরিক ও নৈতিক তথ্য-ব্যবহারকারী হিসেবে গড়ে তোলে। শিক্ষার্থীরা যদি তথ্য শেয়ার করার আগে উৎস যাচাই করে, ভিন্ন মত বিবেচনা করে এবং আবেগনির্ভর প্রচারণা থেকে সতর্ক থাকে, তাহলে একটি তথ্যভিত্তিক, সহনশীল ও জবাবদিহিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।
 
লেখকঃ বার্তা সম্পাদক, ক্যাম্পাস রিপোর্ট
 
তথ্যসূত্রঃ
UNESCO-এর Media and Information Literacy (MIL) বিষয়ক প্রকাশনা, Global Citizenship Education in a Digital Age: Teacher Guidelines (2024) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে Fake News নিয়ে ২০২৫ সালের Zenodo-তে প্রকাশিত গবেষণার তথ্য।
 
 
Link copied!