প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আড্ডা মানেই গল্প, স্বপ্ন আর ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা পরিকল্পনা। কেউ উচ্চশিক্ষার কথা ভাবেন, কেউ চাকরির প্রস্তুতি নেন, আবার কেউ নতুন কিছু করার স্বপ্ন লালন করেন। এমনই এক আড্ডা থেকে জন্ম নিয়েছিল একটি ভাবনা-নিজেদের একটি পোশাকের ব্র্যান্ড গড়ে তোলার। সেই ছোট্ট ভাবনাই আজ ধীরে ধীরে বাস্তব রূপ নিচ্ছে ‘রিদআমস’ নামে।
রিদআমসের গল্প শুধু একটি পোশাকের ব্র্যান্ড তৈরির গল্প নয়; এটি তিন তরুণ শিক্ষার্থীর সাহস, সৃজনশীলতা, বন্ধুত্ব এবং উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্নের গল্প।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছেন তিন বন্ধু-আফিয়া সাইয়ারা আঁখি ও শামিমা শাম্মি, যারা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যয়নরত, এবং এএনএম রিদওয়ানুল হাসান, যিনি টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। ভিন্ন একাডেমিক পটভূমি হলেও তাদের চিন্তা, আগ্রহ এবং নতুন কিছু করার ইচ্ছা এক জায়গায় মিলিত হয়েছিল।
আড্ডা থেকেই শুরু
সবকিছুর শুরু হয়েছিল খুব সাধারণভাবে। ক্লাসের ফাঁকে, ক্যাম্পাসের চায়ের দোকানে কিংবা বিকেলের আড্ডায় তারা প্রায়ই পোশাক, ফ্যাশন ট্রেন্ড, ডিজাইন এবং তরুণদের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে আলোচনা করতেন। একসময় তাদের মনে প্রশ্ন জাগে—অন্যদের ব্র্যান্ডের পোশাক ব্যবহার করার বদলে নিজেরাই কেন একটি ব্র্যান্ড তৈরি করতে পারবেন না?
সেই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় ‘রিদআমস’-এর ধারণা।
প্রথমদিকে বিষয়টি ছিল শুধুই একটি স্বপ্ন। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বুঝতে পারেন, পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে ঝুঁকি নিতে হবে এবং কাজ শুরু করতে হবে। এরপর সীমিত পুঁজি ও সীমিত সম্পদ নিয়েই তারা এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ছোট পরিসরে যাত্রা
ব্র্যান্ডটির যাত্রা শুরু হয় কয়েকটি টি-শার্ট দিয়ে। বড় কোনো শোরুম বা অফিস ছাড়াই অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার মাধ্যমে নিজেদের প্রথম সংগ্রহ বাজারে আনেন তারা।
শুরুর দিনগুলো মোটেও সহজ ছিল না। ডিজাইন নির্বাচন, কাপড় সংগ্রহ, প্রিন্টিং, উৎপাদন, ছবি তোলা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা—সবকিছুই নিজেদের হাতে সামলাতে হয়েছে।
তিন বন্ধু নিজেদের দক্ষতা অনুযায়ী কাজ ভাগ করে নেন। কেউ ডিজাইন ও ব্র্যান্ডিংয়ের দায়িত্ব নেন, কেউ উৎপাদন ও মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করেন, আবার কেউ বিপণন ও গ্রাহকসেবার দায়িত্ব পালন করেন।
ধীরে ধীরে পরিচিতদের মাধ্যমে প্রথম অর্ডার আসতে শুরু করে। সেই ছোট ছোট সাফল্যই তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা জোগায়।
প্রকৌশল শিক্ষার সঙ্গে উদ্যোক্তা জীবন
প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা এমনিতেই সময়সাপেক্ষ এবং চ্যালেঞ্জিং। ক্লাস, ল্যাব, অ্যাসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট ও পরীক্ষার ব্যস্ততার মাঝেও রিদআমসকে এগিয়ে নেওয়া তাদের জন্য সহজ ছিল না।
তবে তারা মনে করেন, উদ্যোক্তা হওয়ার অভিজ্ঞতা তাদের বইয়ের বাইরের শিক্ষা দিয়েছে। ব্যবসা পরিচালনা, দলগত কাজ, সময় ব্যবস্থাপনা, গ্রাহকের চাহিদা বোঝা, সমস্যা সমাধান এবং নেতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা তারা বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অর্জন করছেন।
তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন শুধু ডিগ্রি অর্জনের জন্য নয়; বরং নিজের দক্ষতা ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। সেই সুযোগটিই তারা কাজে লাগাতে চেয়েছেন।
মান ও সৃজনশীলতায় গুরুত্ব
রিদআমসের প্রতিষ্ঠাতারা শুরু থেকেই পণ্যের মানের বিষয়ে আপসহীন থাকার চেষ্টা করছেন। তাদের বিশ্বাস, একটি ব্র্যান্ডের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো গ্রাহকের আস্থা।
এ কারণে কাপড় নির্বাচন, ডিজাইনের বৈচিত্র্য, প্রিন্টের মান এবং আরামদায়ক ব্যবহারের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তরুণদের রুচি ও সমসাময়িক ফ্যাশন ট্রেন্ড বিবেচনায় রেখে নতুন নতুন ডিজাইন তৈরির চেষ্টা চলছে।
তারা চান, রিদআমসের প্রতিটি পণ্য শুধু পোশাক হিসেবে নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করুক।
বন্ধুত্ব থেকে ব্র্যান্ড
রিদআমসের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তিন বন্ধুর পারস্পরিক বিশ্বাস ও বোঝাপড়া। ব্যবসায়িক সম্পর্কের আগে তারা বন্ধু, আর সেই বন্ধুত্বই তাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
অনেক সময় উদ্যোক্তা উদ্যোগ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। কিন্তু মতবিনিময়, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং একে অপরের প্রতি আস্থার কারণে তারা সেসব বাধা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছেন।
তাদের কাছে রিদআমস কেবল একটি ব্যবসা নয়; এটি বন্ধুত্ব, পরিশ্রম, সৃজনশীলতা এবং আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
ভবিষ্যতের স্বপ্ন
বর্তমানে অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তারা রিদআমসকে একটি সুপরিচিত বাংলাদেশি ফ্যাশন ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান।
এ লক্ষ্যে নতুন পোশাকের সংগ্রহ যুক্ত করা, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, বিক্রয়ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং আরও বৃহৎ পরিসরে গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও রিদআমসের পণ্য পৌঁছে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তারা।
তাদের বিশ্বাস, সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর পরিশ্রম এবং গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে একদিন রিদআমস দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক বাজারেও পরিচিতি লাভ করবে।
স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলা
বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাধারণ আড্ডা থেকে শুরু হওয়া যে ভাবনা, আজ তা একটি উদ্যোক্তা যাত্রার ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমিত পুঁজি, ব্যস্ত শিক্ষাজীবন এবং নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও তিন বন্ধু তাদের স্বপ্নকে থামিয়ে রাখেননি।
রিদআমসের গল্প প্রমাণ করে, বড় কিছু শুরু করার জন্য সবসময় বড় পুঁজি প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন একটি সাহসী চিন্তা, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি এবং একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা।
ক্যাম্পাসের আড্ডা থেকে শুরু হওয়া সেই স্বপ্নযাত্রা আজও চলছে। আর সেই যাত্রার নাম-রিদআমস। ওয়েব সাইট ও ফেসবুক লিংক
