আব্দুল্লাহ আর রাফি,গোবিপ্রবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:১৩ পিএম
শনিবার ২৬, সেপ্টেম্বর ২০২৬ -- : -- --
ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট
১৮তম বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষা, ২০২৫-এর চূড়ান্ত ফলে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) আইন বিভাগের পাঁচ শিক্ষার্থী সিভিল জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষের আফরিনা আনসারী তুলি, ২০১৬–১৭ শিক্ষাবর্ষের হাসান মাহমুদ ও এমদাদুল ইসলাম, ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষের মোহাম্মদ শিবলু রহমান এবং ২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের দেবব্রত ভট্টাচার্য্য।
একসঙ্গে পাঁচ শিক্ষার্থীর এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত আইন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে গোবিপ্রবির আইন বিভাগে এবারই প্রথম কোনো নারী শিক্ষার্থী বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ায় সাফল্যটি পেয়েছে বাড়তি মাত্রা।
"আল্লাহ চেয়েছেন বলেই এখানে আসতে পেরেছি"
সাফল্যের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে ২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আফরিনা আনসারী তুলি বলেন, “এই অনুভূতি আসলে ভাষায় প্রকাশ করাটা কঠিন। আল্লাহর প্রতি আমি লাখো কোটি শুকরিয়া জ্ঞাপন করি, যে আল্লাহ আমাকে এই দায়িত্ব পালনের জন্য মনোনীত করেছেন। এই পুরো জার্নিতে আমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবসময় আমাকে সাহস দিয়েছে—আমাকে দিয়ে হবে। আমি চেষ্টা করেছি, সবাই দোয়া করেছে এবং আল্লাহ চেয়েছেন বলে এখানে আসতে পেরেছি।”
অনুজদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “তারা যেন কখনো হাল না ছাড়ে, তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টাটা করে যায় এবং সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করে।”
"প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক পরিবারের সন্তান হাসান মাহমুদ"
২০১৬–১৭ শিক্ষাবর্ষের হাসান মাহমুদের সাফল্যের গল্পটিও সংগ্রাম ও অধ্যবসায়ের। নিজের পড়াশোনা ও বেড়ে ওঠার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমার পড়াশোনা এবং বেড়ে ওঠা একদম প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে, এক মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবার থেকে। মাধ্যমিক পাসের পর থেকেই টিউশন করাতাম এবং সেই টাকা দিয়ে নিজের পড়াশোনার খরচ চালানোর চেষ্টা করতাম।”
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও টিউশনি ও কোচিংয়ে ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। হাসান মাহমুদ বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে অনেক টিউশন করিয়েছি, বিভিন্ন কোচিংয়ে ক্লাস নিয়েছি। এটা আমার বিজেএস পরীক্ষায় অনেক হেল্প করেছে। আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে আমি আমার পড়াশোনা চালিয়ে গেছি। আলহামদুলিল্লাহ, ১৮তম বিজেএসে সিভিল জজ হিসেবে রেকমেন্ডেড হয়েছি।”
বিজেএস প্রত্যাশীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “হতাশ না হয়ে লেগে থাকতে হবে। পরিশ্রম কখনো বৃথা যায় না। একদিন না একদিন সফলতা আসবেই।”
"প্রথমবারেই সাফল্য দেবব্রত'র"
২০১৯–২০ শিক্ষাবর্ষের দেবব্রত ভট্টাচার্য্য জানান, এলএল.এম শেষ হওয়ার আগেই তিনি বিজেএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নেন। শুরুতে নার্ভাস থাকলেও বন্ধু, সিনিয়র ও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা তাঁকে আত্মবিশ্বাসী হতে সহায়তা করেছে।
তিনি বলেন, “আসলে আমার এলএল.এম শেষ হওয়ার আগে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা দিই। শুরুতে খুব নার্ভাস থাকলেও বন্ধু এবং সিনিয়রদের যথেষ্ট মোটিভেশন পেয়েছি। আমার শিক্ষকরা অনেক অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। আজকের এ রেজাল্টে আমি খুব খুশি। ঈশ্বরের কৃপায়, সকলের দোয়া ও শুভকামনায় প্রথমবারেই এ ফলাফল আমার জন্য অত্যন্ত আনন্দের ছিল।”
অনুজদের উদ্দেশে দেবব্রত বলেন, “আপনারা যে সেমিস্টারেই থাকুন, ভিত্তি খুব মজবুত করবেন। আইনের পাশাপাশি জেনারেল বিষয়ের দিকে খুব শক্ত করে নজর দেবেন। বিজেএসে আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার বিকল্প কিছু নেই। হতাশ হওয়া যাবে না।”
গোবিপ্রবি আইন বিভাগের এবারের সাফল্য নিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাফল্য এবার অভাবনীয়। আশা করি, পরবর্তী ব্যাচগুলো থেকে বিজেএসসহ অন্য অনেক ক্ষেত্রেও সফল মানুষ আমরা পাব।” নিজের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, “জীবনে যেন ভালো মানুষ হতে পারি।”
‘এবারই প্রথম একসঙ্গে পাঁচজন সুপারিশপ্রাপ্ত’
গোবিপ্রবির আইন অনুষদের ডিন ও আইন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সহযোগী অধ্যাপক মানসুরা খানম বলেন, “প্রথম ব্যাচ থেকে এ পর্যন্ত মোট পাঁচটি ব্যাচ গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেছে। এর আগে আমাদের তিনজন শিক্ষার্থী বিচারক হতে পেরেছে। তবে এবারই প্রথম একসঙ্গে পাঁচজন সুপারিশপ্রাপ্ত হলো। এর চেয়েও আনন্দের বিষয়, এবারই প্রথম আমাদের কোনো নারী শিক্ষার্থী সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।”
শিক্ষার্থীদের সময়মতো পড়াশোনা শেষ করার সুযোগ তৈরির বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা সবসময় চেষ্টা করছি সঠিক সময়ে শিক্ষার্থী ভর্তি নেওয়া এবং সেশনজটমুক্তভাবে সময়মতো স্নাতক সম্পন্ন করানোর। এর ফলে তারা বাংলাদেশ জুডিসিয়াল সার্ভিসের পরীক্ষায় সময়মতো অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। শিক্ষক হিসেবে এটুকুই আমাদের অর্জন।”
শিক্ষার্থীদের সাফল্যের কৃতিত্ব তাঁদের পরিশ্রমকেই দিয়ে তিনি বলেন, “শিক্ষার্থীরা যে সাফল্য অর্জন করেছে, তা তাদের পরিশ্রম ও প্রচেষ্টার ফল। তাদের সাফল্যে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। আশা করি, তারা জুডিসিয়াল সার্ভিসে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে এবং তাদের মাধ্যমে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম আরও ছড়িয়ে পড়বে।”
‘আইন বিভাগ তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করেছে’
আইন অনুষদের সাবেক ডিন ও আইন বিভাগের সাবেক সভাপতি ড. মো. রাজিউর রহমান বলেন, “আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের এই অর্জন আইন বিভাগ তথা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সুনাম বৃদ্ধি করেছে। আমাদের শিক্ষার্থীরা একাডেমিক ও ক্যারিয়ার-বেইজড লেখাপড়ায় মনোযোগী হয়ে উঠছে। ক্লিনিক্যাল লিগ্যাল এডুকেশন পদ্ধতির বাস্তবায়নে বিভাগের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।”
একসঙ্গে পাঁচ শিক্ষার্থীর বিচারক হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্তির বিষয়ে তিনি বলেন, “আমাদের পাঁচজন মেধাবী শিক্ষার্থী এবার বিচারক হয়েছে-বিষয়টি অত্যন্ত আনন্দের। আমাদের প্রত্যাশা ছিল আট থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী এবার বিচারক হবে। তবে ১৯তম বিজেএস পরীক্ষায় আমরা আরও বেশি সংখ্যক সফলতা অর্জন করব বলে বিশ্বাস রয়েছে। আশা করি, আইন বিভাগের সাফল্যের এই ধারা বজায় থাকবে।”
গোবিপ্রবি আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের এই সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষার অগ্রযাত্রায় একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। একসঙ্গে পাঁচ শিক্ষার্থীর বিচার বিভাগে প্রবেশের সুযোগ ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদেরও বিজেএসসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণে অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে প্রত্যাশা করছেন শিক্ষকরা।