প্রকাশিত: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:১০ পিএম
নিজ বিভাগের অফিস কক্ষে কর্মচারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারানো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সাবেক সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা হত্যাকাণ্ডের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও বিচার প্রক্রিয়ার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
হত্যাকাণ্ডের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের গঠিত প্রাথমিক তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন সিন্ডিকেটে উপস্থাপনের পর ঘটনাটির অধিকতর তদন্তে নতুন উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এদিকে, মামলার ৬ মাস পেরোলেও এখনো চার্জশিট দাখিল করতে পারেনি পুলিশ। পাশাপাশি স্বীকারোক্তি বদলে এখন নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন মামলার প্রধান আসামি কর্মচারী ফজলু।
চলতি বছরের ৪ মার্চ বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিওলজি অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদের দ্বিতীয় তলায় সমাজকল্যাণ বিভাগের নিজ অফিস কক্ষে সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনা কে গলা কেটে হত্যা করে কর্মচারী ফজলুর রহমান। পরবর্তীতে সে নিজেও নিজের গলায় ছুরি চালিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। নিহত শিক্ষিকার চিৎকারে ভবনে কর্তব্যরত আনসার সদস্য ও শিক্ষার্থীরা দৌড়ে গিয়ে দরজা ভেঙে রক্তাক্ত অবস্থায় দুজনকে পড়ে থাকতে দেখে। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডি ও পুলিশ এসে দুজনকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালে প্রেরণ করে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া কে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত কর্মচারী ফজলুকে প্রধান আসামি করে ৪ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ১০৯ ধারায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত শিক্ষিকার স্বামী ইমতিয়াজ সুলতান। মামলার অন্যান্য আসামিরা হচ্ছেন - সাবেক কর্মচারী উপ রেজিস্ট্রার বিশ্বজিৎ কুমার বিশ্বাস, বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সরকার ও সহকারী অধ্যাপক হাবিবুর রহমান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মামলার প্রধান আসামি ফজলুকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সুস্থ হওয়ার পর গত ১ এপ্রিল আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার অপর তিন আসামি এখনও পলাতক রয়েছে।
থানায় মামলার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের পক্ষ থেকেও রুনা হত্যার ঘটনায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়। গত ৭ মার্চ হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান এবং উপ-রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) মো. গোলাম মওলা কে সদস্য সচিব করে ৫ সদস্যের একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে প্রশাসন। তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ২৯ জুন অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেটের ২৭৪তম (সাধারণ) সভার ৩২ নং প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত মোতাবেক নৃশংসভাবে হত্যাকান্ডের বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটি গঠন করে প্রশাসন।
কমিটিতে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য এবং সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন একাডেমিক শাখার উপ-রেজিস্ট্রার মাছুদুল হক তালুকদার। এছাড়াও সদস্য হিসেবে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (পি.আর.এল) ড. আশরাফুর রহমান এবং বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের এ্যাডভোকেট ড. মুহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন। ইতোমধ্যেই এই কমিটির দাখিলকৃত প্রতিবেদন আগামী সিন্ডিকেট সভায় তোলা হবে বলে জানা গেছে।
এদিকে, মামলার ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে পারেনি পুলিশ। পাশাপাশি বিচারিক প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করতে কুটচালের আশ্রয় নিয়েছে মামলার প্রধান আসামি কর্মচারী ফজলু ও।
ঘটনাস্থল থেকে নিজ গলায় ছুরি চালানোরত অবস্থায় ফজলুকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক লিখিত বক্তব্যে হত্যার দায় স্বীকার করে ফজলু। সেখানে সে সমাজকল্যাণ বিভাগ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে বদলিজনিত ক্ষোভ থেকে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে স্বীকারোক্তি দিলেও কারাগারে যাওয়ার পর সেই বক্তব্য থেকে সম্পূর্ণ পালটে ফেলে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন।
ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি সুত্র জানায়, কারাগারে গিয়ে তারা প্রায় দুই ঘণ্টা যাবত ফজলুর সাক্ষাৎকার নেন। এসময় তারা মৌখিকভাবে প্রশ্ন করলেও ফজলু তার জবাব দেয় লিখিত আকারে। সেখানে ফজলু জানায়, শিক্ষিকা রুনা তার কাছে থিসিস পেপার চাইলে সে কক্ষে গিয়ে দেখে, দুই মুখোশধারী ব্যক্তি রুনাকে ছুরিকাঘাত করছে। এতে বাধা দিতে গেলে মুখোশধারীরা তাকেও আঘাত করে পালিয়ে যায়। এরপর সে অচেতন হয়ে পড়েন বলে দাবি করে।
কিন্তু আদতে কোন মুখোশধারীর আঘাতে নয়, ইবি শিক্ষিকা রুনা হত্যার দিনে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে স্পষ্টভাবে ফজলুর নিজেকেই নিজের গলায় ছুরি চালাতে দেখা গেছে। কমিটির সদস্যরা জানান, মুখোশধারীদের উপস্থিতির দাবি করলেও ‘ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগানো একটি রুম থেকে দুজন মুখোশধারী কীভাবে ভেতর থেকে বের হলো এবং তারপর আবার কে দরজা বন্ধ করল?’—তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি ফজলু।
হত্যাকাণ্ডের দিনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, সেদিন বিকাল ৪টা ১ মিনিটে তৃতীয় তলার একটি কক্ষ থেকে পলিথিনে মোড়ানো একটি বস্তু নিয়ে বের হন কর্মচারী ফজলু। পরে বিকাল ৪টা ১০ মিনিটে তিনি ভবনের দ্বিতীয় তলায় রুনার কক্ষের দিকে যান। এর প্রায় দুই মিনিট পর রুনার 'বাঁচাও বাঁচাও' চিৎকার শুনে ভবনের নীচে দায়িত্বরত আনসার সদস্য ও শিক্ষার্থীরা দৌড়ে উপরে গিয়ে রুনার কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ দেখতে পান। পরে তারা দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলে শিক্ষিকা রুনাকে রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে থাকতে এবং কর্মচারী ফজলুকে নিজের গলায় ছুরি চালাতে দেখেন।
জানতে চাইলে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে, আমাদের কমিটির সব সদস্য জেল সুপারের রুমে বসে প্রায় দুই ঘণ্টা তার সাক্ষাৎকার নিয়েছি। সে তো মুখ উত্তর দিতে পারে না, লিখিত দিছে।কোন মানুষ যদি কেউ খুন করে, কেউই তার দোষ স্বীকার করতে চায় না। বেশিরভাগ সময় আইনজীবীদের পরামর্শে তারা অস্বীকার করে। কিন্তু বিভিন্ন যুক্তি-তর্কে, বিভিন্ন ডকুমেন্টেশন দিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে সে কথাটা মিথ্যা বলতেছে। সে যখন আমাদের বলেছে যে, খুন আমি করিনি', তখন বিভিন্ন দিকে প্রশ্ন করা হলে আর উত্তর দিতে পারে নাই। তখন তো বোঝাই যায় সব।"
পরবর্তীতে গঠিত উচ্চতর ক্ষমতা সম্পন্ন কমিটির আহবায়ক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. এমতাজ হোসেন বলেন, পূর্ববর্তী ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির রিপোর্ট, সিসিটিভি ফুটেজ, ঘটনার সাক্ষী সবকিছুই আমাদের কাছে রয়েছে। সেই মোতাবেক আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছি। এখানে আসামির স্বীকার করা বা অস্বীকার করায় কিছু যায় আসে না। সমস্ত তথ্য প্রমাণ তার বিরুদ্ধে রয়েছে। আমরা আমাদের তদন্ত শেষ করে রিপোর্ট জমা দিয়েছি। প্রশাসন তা আগামী সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করবে।
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ইবি থানার ওসি এস এম মামুনুর রশীদ বলেন, ইবি শিক্ষিকা রুনা হত্যা মামলার তদন্ত চলছে যা প্রায় শেষ পর্যায়ে। হত্যার বিভিন্ন আলামত অনেকদিন আগেই ফরেনসিকে পাঠানো হয়েছে। আগামী সপ্তাহে সামান্য কিছু কাজ হয়ে গেলেই আমরা চেষ্টা করবো আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে। এখানে আসামি কখন কী বলেছে - সেটার তেমন কোন প্রভাব নেই। তদন্ত নিজস্ব গতিতে হয়েছে।
