মঙ্গলবার ২৫, আগস্ট ২০২৬

মঙ্গলবার ২৫, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

আমি না চললে সব উপজেলা বন্ধ হয়ে যাবে: সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান

মৌলভীবাজার থেকে রাজন হোসেন তৌফিক

প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:৫০ পিএম

ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট

মৌলভীবাজার মুমূর্ষু রোগী বহনের জন্য সরকারি অ্যাম্বুলেন্স। অথচ সেই অ্যাম্বুলেন্সের চালক ব্যস্ত সিভিল সার্জনের অফিসিয়াল গাড়ি চালাতে! এভাবেই প্রায় নয় মাস ধরে চালক সংকটে পড়ে আছে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র সরকারি অ্যাম্বুলেন্স। ফলে জরুরি রোগী নিয়ে চরম বিপাকে পড়ছেন স্বজনরা। বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা খরচ করে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স কিংবা অন্য যানবাহনের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে দরিদ্র মানুষকে।

এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমানের বিরুদ্ধে। শুধু অ্যাম্বুলেন্সের চালককে নিজের গাড়িতে ব্যবহার নয়, তার বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, সরকারি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, অর্থ আত্মসাৎ ও অসদাচরণসহ একাধিক অভিযোগ তুলেছে ‘স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিক ফোরাম’। অভিযোগের কপি জমা দেওয়া হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে।


অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালককে সিভিল সার্জনের গাড়ি চালানোর কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্সটি জরুরি ও মুমূর্ষু রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য মৌলভীবাজার সদর কিংবা সিলেটে স্থানান্তরে ব্যবহারের কথা। 

কিন্তু চালক না থাকায় অ্যাম্বুলেন্সটি দীর্ঘদিন ধরে সেবা দিতে পারছে না। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র রোগীরা।

কালাম নামে এক রোগীর স্বজন ক্ষোভের সাথে বলেন, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় জরুরি রোগী নিয়ে আমাদের ৮-১০ হাজার টাকা দিয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে হচ্ছে। দরিদ্র মানুষের জন্য এই খরচ বহন করা খুবই কষ্টকর। সরকারি গাড়িটা পড়ে আছে, অথচ আমরা সেবা পাচ্ছি না।

অ্যাম্বুলেন্সের চালককে নিজের গাড়িতে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, জুড়ীতে অ্যাম্বুলেন্সের সার্ভিস কম, প্রয়োজনও কম। তাই পছন্দ করে নিয়ে আসছি। সিভিল সার্জনের গাড়ি তো বন্ধ থাকতে পারে না! আমি না চললে সব উপজেলা বন্ধ হয়ে যাবে, সব উপজেলার সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাবে।

তার এই বক্তব্য নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন কর্মকর্তার সরকারি গাড়ি সচল রাখার চেয়ে মুমূর্ষু রোগীর জরুরি পরিবহন নিশ্চিত করাই কি অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত নয়

জুড়ী প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, সিভিল সার্জনের গাড়ি সচল রাখার জন্য যদি রোগী পরিবহনের সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের চালককে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি সময়ে সেবা দেবে কে? একজন কর্মকর্তার যাতায়াতের চেয়ে একজন রোগীর জীবন রক্ষা কি বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়? দ্রুত জুড়ীর সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি পুরোপুরিভাবে সচল করে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা দরকার।

‘স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিক ফোরাম’র লিখিত অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জেলার বিভিন্ন সরকারি টেন্ডার একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। নামসর্বস্ব ও সুবিধাভোগী ঠিকাদারদের মাধ্যমে আর্থিক অনিয়ম করা হচ্ছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে ঘুষ নেওয়া হচ্ছে। এমনকি কর্মীদের বেতন থেকেও নিয়মিত অর্থ কেটে রাখা হয়। 

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একটি কক্ষ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি সেখানে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগও তোলা হয়েছে। এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতেও তিনি বিভিন্ন বাহানা দেখিয়ে অন্যত্র চলে যান বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, টাকা ছাড়া এখানে কোনো কাজ হয় না। টাকা দিলে কাজ করা যায়, অন্যথায় আওয়ামী লীগের দোসর ট্যাগসহ বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়।

শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিক মো. এহসানুল হক বলেন, নিজের ঢোল তো নিজেকেই পেটাতে হয় তাই না। বিভিন্ন সময় তাকে কোনো অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হ্যাঁ, দেখছি, দেখবো, ব্যবস্থা দিচ্ছি, ব্যবস্থা নেবো। এভাবেই বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তো আমি খারাপ হিসেবে বিবেচিত হবো। নিজের আচরণ সম্পর্কে তিনি দাবি করেন, মৌলভীবাজারে এযাবতকালে যত সিভিল সার্জন এসেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভদ্র ও রুচিশীল কর্মকর্তা আমি।

অভিযোগের অন্যান্য বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি অসুস্থতার কথা বলে দ্রুত কার্যালয় থেকে বের হয়ে যান।

এ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, সিভিল সার্জনের কথাগুলো একদম অপেশাদারিত্ব। একজন সিভিল সার্জনের পক্ষ থেকে এ ধরনের কথা মোটেও কাম্য নয়। বিভাগীয় অফিসে তো উনাকে দেখি না, মাসে একদিন আসেন। জনগণের সেবা সবার আগে, আগে জনগণ পরে কর্মচারী। বিষয়টির খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবো।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি উপজেলার একমাত্র অ্যাম্বুলেন্স ৯ মাস ধরে চালক সংকটে থাকা মানে ওই উপজেলার জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে কার্যত অচল করে দেওয়া। এতে রোগীর মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের নেতারা অবিলম্বে জুড়ীর অ্যাম্বুলেন্সের জন্য নতুন চালক নিয়োগ এবং সিভিল সার্জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

 

Link copied!