মঙ্গলবার ২৫, আগস্ট ২০২৬

মঙ্গলবার ২৫, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

ভেঙে পড়ল রাবির সেই কৃষ্ণচূড়া

রাবি থেকে মো.রেজওয়ান

প্রকাশিত: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০৬ পিএম

ছবি। ক্যাম্পাস রিপোর্ট

একটি গাছ। বছরের পর বছর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা। ঋতু বদলেছে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থী এসেছে-গেছে, বদলেছে ক্যাম্পাসের অনেক কিছু। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবনের (১ম বিজ্ঞান ভবন)  সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়া গাছটি ছিল একই রকম পরিচিত।

সোমবার (২৪ আগস্ট) হঠাৎ ভেঙে পড়েছে সেই গাছ। এতে যেন ভেঙে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর স্মৃতির একটি অংশও।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সামনে, প্রথম বিজ্ঞান ভবন বা সত্যেন্দ্রনাথ বসু একাডেমিক ভবনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই কৃষ্ণচূড়া ছিল ক্যাম্পাসের পুরোনো পরিচিত দৃশ্যগুলোর একটি। গাছটির বয়স কত বছর তা হয়তো অনেকেরই জানা নেই। তবে কত প্রজন্মের শিক্ষার্থী যে এর ছায়ায় দাঁড়িয়েছেন, বসেছেন, গল্প করেছেন কিংবা ছবি তুলেছেন, তার হিসাব নেই।

ক্যাম্পাসে নতুন শিক্ষার্থী এলেই ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠতেন এই গাছটির সঙ্গে। কেউ হয়তো প্রথমে জানতেন না এর নাম। পরে বন্ধুর কাছে শুনেছেন—এটাই সেই পুরোনো কৃষ্ণচূড়া। বসন্তে যখন গাছের ডালে ডালে লাল ফুল ফুটত, তখন চারপাশের দৃশ্যটাই বদলে যেত।


রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এমনিতেই সবুজে ঘেরা। তবে কৃষ্ণচূড়ার মৌসুমে এর সৌন্দর্যে যোগ হয় আলাদা মাত্রা। সবুজ পাতার ফাঁকে লাল ফুল, পাশে একাডেমিক ভবন—দৃশ্যটি শিক্ষার্থীদের ক্যামেরায় বহুবার বন্দী হয়েছে।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু ভবনের সামনে দিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা অনেক সময় একটু থেমেছেন। কেউ ছবি তুলেছেন, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করেছেন। কেউ আবার ক্লাসের অপেক্ষায় গাছটির নিচে বসে থেকেছেন।

গাছটির নিচে হয়তো কারও বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রথম বন্ধুত্বের গল্প আছে। কারও আছে প্রথম বর্ষের আড্ডা। কারও কাছে এটি পরীক্ষার আগের উদ্বেগের সময় কাটানোর জায়গা। আবার কারও কাছে প্রিয় মানুষটির সঙ্গে কাটানো কোনো বিকেলের স্মৃতি।


বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে কিছু জায়গা ও কিছু স্থাপনা সময়ের সঙ্গে কেবল স্থান বা বস্তু থাকে না, হয়ে ওঠে স্মৃতির অংশ। একটি পুরোনো ভবন, একটি রাস্তা, একটি বেঞ্চ কিংবা একটি গাছ—এসবের সঙ্গে জড়িয়ে যায় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু ভবনের সামনের কৃষ্ণচূড়াটিও তেমনই একটি স্মৃতিচিহ্ন হয়ে উঠেছিল।

অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করে অন্য শহরে চলে গেছেন। কেউ চাকরি করছেন, কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা মনে পড়লে তাঁদের চোখের সামনে ভেসে উঠতে পারে পরিচিত কোনো রাস্তা, কোনো ভবন কিংবা সেই কৃষ্ণচূড়ার নিচে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধুদের মুখ।

সোমবার গাছটি ভেঙে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের আক্ষেপের বিষয়টি তাই আলাদা করে চোখে পড়েছে। কেউ পুরোনো ছবি খুঁজে বের করেছেন, কেউ গাছটির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতির কথা লিখেছেন। কেউ শুধু একটি ছবি দিয়ে জানিয়েছেন, কতটা খারাপ লাগছে।

এই কৃষ্ণচূড়ার নিচে বসা শিক্ষার্থীরা হয়তো জানতেন না, তাঁরা নিজেদের অজান্তেই একটি দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠছেন।

কতজন শিক্ষার্থী সেখানে দাঁড়িয়ে পরীক্ষার ফল নিয়ে কথা বলেছেন, কতজন ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করেছেন, কতজন বন্ধুর সঙ্গে ঝগড়া করে আবার মিটমাট করেছেন—এসবের কোনো হিসাব নেই। গাছটি কিছু বলেনি। শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে থেকেছে।

আর সেই নীরব উপস্থিতিই হয়তো তাকে এত আপন করে তুলেছিল।

গাছটি এখন আর দাঁড়িয়ে নেই। তার জায়গাটি হয়তো ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। নতুন শিক্ষার্থীরা একদিন হয়তো সেই জায়গা দিয়ে হেঁটে যাবে, কিন্তু তাঁরা জানবে না—কয়েক বছর আগেও এখানে দাঁড়িয়ে ছিল একটি পুরোনো কৃষ্ণচূড়া।

তাঁদের কাছে জায়গাটি হয়তো খালি থাকবে না। বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো বিকেল, ক্লাসের ফাঁকে আড্ডা আর বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের অগণিত ছোট ছোট গল্প।

একটি গাছ ভেঙে পড়েছে ঠিকই। কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো তো আর ভেঙে পড়েনি।

সত্যেন্দ্রনাথ বসু ভবনের সামনে হয়তো আর সেই কৃষ্ণচূড়ার ছায়া পাওয়া যাবে না। তবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থীর স্মৃতিতে গাছটি থেকে যাবে—লাল ফুলে ভরা, পুরোনো, পরিচিত এবং নিজের মতো করে আপন।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মামুনুজ্জামান স্নিগ্ধ তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, 'আমাদের বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে! মানুষ, গাছ, প্রাণ কিংবা প্রকৃতি কারো প্রতিই হয়ত এজন্য মায়া রাখতে নেই। স্মৃতিকাতর হই, হৃদয় ভারী হয়ে আসে।'

আরেক শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস রিতু লিখেছেন, 'ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে বের হওয়ার পর আব্বুকে প্রথম দেখেছিলাম এই কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে। সেই মুহূর্তের সঙ্গে সেই জায়গাটার সঙ্গে গাছটারও যেন একটা অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আজ যখন দেখলাম গাছটা আর নেই মনে হলো পরিচিত কোনো আপনজনকে হারিয়ে ফেলেছি।'

Link copied!