বৃহস্পতিবার ৩০, জুলাই ২০২৬

বৃহস্পতিবার ৩০, জুলাই ২০২৬ -- : -- --

গোমতীর পাড়ে ১৭ বছরের মিষ্টি সংগ্রাম

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম

গোমতী নদীর পাড়ের ছোট্ট দোকানে নিজ হাতে আখের রস তৈরি করছেন কৃষক মোতালেব হোসেন। ছবি: ক্যাম্পাস রিপোর্ট

গোমতী নদীর পাড়ে ছোট্ট একটি একচালা দোকান। নদীর উঁচু বাঁধ থেকে তাকালে চোখে পড়ে কয়েকটি খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা জীর্ণশীর্ণ সেই দোকানটি। নেই কোনো চাকচিক্য, নেই বড় কোনো আয়োজন। সামনে মোটরচালিত আখ মাড়াইয়ের মেশিন, পাশে একটি কাঠের টেবিল। ভেতরে একটি খাট আর একটি বৈদ্যুতিক বাতি। দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে সেই ক্ষীণ আলোতেই কেটে যায় রাত। এই ছোট্ট দোকানই কৃষক মোতালেব হোসেনের কর্মস্থল, আবার অনেক সময় রাতের আশ্রয়ও। এখানেই তিনি আখ বিক্রি করেন, আখের রস তৈরি করেন এবং রাত নামলে পাশের আখের জমি পাহারা দেন।

কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার গোমতী নদীসংলগ্ন গাজীপুর গ্রামের কৃষক মোতালেব হোসেন। কৃষিকাজের পাশাপাশি প্রায় ১৭ বছর ধরে গোমতী নদীর চরে আখ চাষ ও আখের রস বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তিনি। নিজের জমিতে আখ ফলান, সেই আখ নিজেই বিক্রি করেন। আবার সেই আখ মোটরচালিত মেশিনে চিবিয়ে তাজা রস তৈরি করে তুলে দেন ক্রেতাদের হাতে।

গোমতীর চরের জমিই তাঁর আয়ের অন্যতম ভরসা। বর্তমানে প্রায় ৪০ শতক জমিতে আখ চাষ করছেন মোতালেব। তাঁর চাষ করা আখ দেশি জাতের। আকারে কিছুটা চিকন হলেও এসব আখে রসের পরিমাণ বেশি। সেই রসও বেশ সুমিষ্ট। জমি থেকে আখ তুলে এনে দোকানের পাশেই মোটরচালিত মেশিনে রস তৈরি করেন তিনি। এরপর সেই তাজা রসই বিক্রি করেন সেখানে আসা মানুষের কাছে।

একসময় হাতে ঘোরানো মেশিনে আখের রস বিক্রি করতেন মোতালেব। সময়ের সঙ্গে বদলেছে রস তৈরির মেশিন, কিন্তু বদলায়নি তাঁর পরিশ্রমের ধরন। নিজের উৎপাদিত আখ নিজেই বাজারজাত করেন। আবার সেই আখের রসও নিজের হাতে তৈরি করে দেন ক্রেতাদের। আখের মিষ্টি রসের সঙ্গে মিশে আছে তাঁর দীর্ঘদিনের শ্রম, অধ্যবসায় আর জীবনের গল্প।

স্থানীয়দের কাছেও মোতালেবের আখের রসের বেশ সুনাম রয়েছে। গোমতীর পাড়ে ঘুরতে আসা অনেকেই তাঁর দোকানে এসে তাজা আখের রস পান করেন। কেউ আসেন স্থানীয়ভাবে, আবার কেউ দূরদূরান্ত থেকে বন্ধুদের নিয়ে এখানে বসেন। গরমের দিনে এক গ্লাস তাজা আখের রস যেন তাঁদের জন্য বাড়তি স্বস্তি।

সম্প্রতি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে ঘুরতে এসে স্থানীয় বন্ধু রাকিবের সঙ্গে মোতালেবের দোকানে আখের রস পান করতে আসেন মোজাম্মেল হক।

রাকিব ও মোজাম্মেল জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই দোকানে আখের রস বিক্রি হচ্ছে। পাশের জমি থেকে আখ তুলে এনে চোখের সামনে মেশিনে রস তৈরি করে দেওয়া হয়। তাজা আখের রস পান করতে পারায় তাঁদের ভালো লাগে। গরমে এই রস শরীর ও মনে প্রশান্তি এনে দেয় বলেও জানান তাঁরা।

মোতালেব হোসেন জানান, তাঁর দোকানে অনেক দূর থেকে মানুষ আখের রস খেতে আসেন। যে কোনো সময় ক্রেতা এলে তিনি নিজের উৎপাদিত আখ দিয়ে তাঁদের জন্য তাজা রস তৈরি করে দেন। নিজের জমির আখ দিয়ে নিজের হাতেই রস তৈরি করে মানুষের হাতে তুলে দিতে পারায় তাঁরও ভালো লাগে।

তবে এই মিষ্টি রসের পেছনে রয়েছে কঠিন জীবনসংগ্রাম। আখ চাষ ও রস বিক্রির আয় দিয়েই চলে মোতালেবের ছয় সদস্যের সংসার। স্ত্রী সন্তানসহ পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। দিনের বেলায় আখ বিক্রি ও রস তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন। আর রাত হলে শুরু হয় আরেক দায়িত্ব, আখের জমি পাহারা দেওয়া।

গোমতীর চরের জমিতে ফসল ফলানো যেমন সহজ নয়, তেমনি সেই ফসল রক্ষা করাও কঠিন। তাই দিনের শেষে ঘরে ফেরার বদলে অনেক রাত কাটে নদীর পাড়ের সেই ছোট্ট দোকানেই। একটি খাটে রাত কাটান তিনি। দোকানের একমাত্র বৈদ্যুতিক বাতির ক্ষীণ আলোয় কখনো বিশ্রাম নেন, আবার প্রয়োজন হলে রাতের আঁধারেই জমির দিকে নজর রাখেন।

মোতালেবের জীবনের এই পথচলায় কিছুটা স্বস্তি এসেছে সরকারের কৃষি কার্ড পাওয়ায়। তবে এখনো কৃষি অধিদপ্তরের কাছ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা পাননি বলে জানান তিনি। আখ চাষে কৃষি অফিসের পরামর্শ ও সহযোগিতা পেলে উৎপাদন আরও ভালো করতে পারবেন। এমন প্রত্যাশা তাঁর।

প্রায় ১৭ বছর ধরে আখ চাষ ও রস বিক্রি করছেন মোতালেব। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর দোকান হয়তো বড় হয়নি, জীবনযাপনেও আসেনি বড় কোনো পরিবর্তন। কিন্তু নিজের শ্রমের ওপর ভরসা করে তিনি টিকে আছেন। গোমতীর চরের ৪০ শতক জমি, নদীর পাড়ের ছোট্ট একচালা দোকান, একটি আখ মাড়াইয়ের মেশিন আর তাঁর নিরলস পরিশ্রমই তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গোমতীর পাড়ে প্রতিদিনই জমে ওঠে মানুষের আনাগোনা। কেউ আসে আখ কিনতে, কেউ আসে তাজা রসের স্বাদ নিতে। আর সেই ব্যস্ততার আড়ালে নীরবে কাজ করে যান মোতালেব। নিজের হাতে আখ ফলান, নিজের হাতেই বিক্রি করেন। সেই আখের রসেই মেটান মানুষের তৃষ্ণা। আর সেই রস বিক্রির আয়েই মেটান ছয় সদস্যের পরিবারের প্রয়োজন।

গোমতীর পাড়ের ছোট্ট জীর্ণশীর্ণ একচালা দোকানটি আজ মোতালেব হোসেনের ১৭ বছরের জীবনসংগ্রামের নীরব সাক্ষী। দিনের পর দিন ঘাম ঝরিয়ে ফলানো আখের মিষ্টি রসে যেমন মানুষের তৃষ্ণা মেটে, তেমনি সেই রসের আয়েই পূরণ হয় তাঁর পরিবারের প্রয়োজন। গোমতীর স্রোতের মতোই বয়ে চলেছে তাঁর জীবন। নিরন্তর, নিঃশব্দ আর সংগ্রামময়।

 

লেখক: রাকিব হোসেন।

Link copied!