প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৭ এএম
মাহবুব আলম
দোয়েল (Copsychus saularis) বাংলাদেশের জাতীয় পাখি। মিষ্টি কণ্ঠের গান, চঞ্চল স্বভাব এবং মানুষের বসতবাড়ির আশপাশে সহজে দেখা যাওয়ার কারণে পাখিটি আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ঘন জঙ্গলের পরিবর্তে মানুষের বসতবাড়ির আশপাশ, গাছের কোটর, মাটির ঘরের চালের ফাঁকা জায়গা, খড়ের চাল কিংবা সবজির মাচায় বাসা বাঁধতেই দোয়েল বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
কিন্তু আধুনিকায়নের প্রভাবে গ্রামীণ পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগের মতো বড় গাছ, ঝোপঝাড়, মাটির ঘর কিংবা খড়ের চাল এখন আর খুব একটা দেখা যায় না। ফলে দোয়েলের নিরাপদ আবাসস্থল দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে অপরিকল্পিত নগরায়ন, বৃক্ষনিধন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের দূষণ এ পাখির অস্তিত্বকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলছে।
সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে বর্তমান আধুনিক কৃষিতে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে। দোয়েলের প্রধান খাদ্য বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়। কিন্তু ফসলের জমিতে অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগের ফলে এসব পোকামাকড় বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। সেই বিষাক্ত পোকামাকড় খাওয়ার কারণে অনেক দোয়েল অকালেই মারা যাচ্ছে কিংবা তাদের প্রজননক্ষমতা দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে প্রাকৃতিকভাবেই দোয়েলের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবও দোয়েলের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। অস্বাভাবিক তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী এবং আকস্মিক আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে দোয়েলের বাসা নষ্ট হচ্ছে, ডিম ও ছানার বেঁচে থাকার হার কমে যাচ্ছে। এতে তাদের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং নতুন প্রজন্মের দোয়েলের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
দোয়েল শুধু সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি কৃষিরও এক নীরব সহযোদ্ধা। মানুষের বসতবাড়ি ও কৃষিজমির আশপাশে বিচরণ করে ক্ষতিকর পোকামাকড় খেয়ে প্রাকৃতিকভাবে ফসল রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ দোয়েল কৃষিতে জৈবিক বালাই ব্যবস্থাপনা (Biological Pest Control)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই দোয়েল হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু আমাদের জাতীয় পাখির বিলুপ্তির ঝুঁকি বৃদ্ধি নয়, বরং কৃষির প্রাকৃতিক ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যাওয়া।
দোয়েলকে রক্ষা করতে হলে কৃষিতে নিরাপদ ও পরিমিত মাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (IPM) সম্প্রসারণ করতে হবে, বসতবাড়ি ও কৃষিজমির আশপাশে দেশীয় গাছ লাগাতে হবে এবং এর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব কৃষি চর্চার মাধ্যমে আমাদের জাতীয় পাখি দোয়েলকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। আমরা সকলে দোয়েল রক্ষায় এগিয়ে আসি।
মাহবুব আলম
কৃষি শিক্ষার্থী ও সোশ্যাল একটিভিস্ট
