মঙ্গলবার ২৮, জুলাই ২০২৬

মঙ্গলবার ২৮, জুলাই ২০২৬ -- : -- --

‎হেপাটাইটিসের নাম জানেন,কিন্তু ঝুঁকি জানেন কি তরুণরা?

গণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মারুফ হাসান

প্রকাশিত: ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:০০ এএম

ছবি।ক্যাম্পাস রিপোর্ট

‎'হেপাটাইটিস', নামটি পরিচিত। কেউ পাঠ্যবইয়ে পড়েছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেনেছেন, আবার কেউ পরিচিত কারও অসুস্থতার সূত্রে রোগটির কথা শুনেছেন। কিন্তু এই রোগ কীভাবে ছড়ায়, কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, টিকা নেওয়া হয়েছে কি না এসব প্রশ্নে এখনো অনেকের মধ্যে রয়েছে দ্বিধা ও অস্পষ্টতা।

‎‎গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে। অধিকাংশ শিক্ষার্থী হেপাটাইটিস সম্পর্কে কিছুটা জানলেও রোগটির সংক্রমণ, প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা বিষয়ে তাদের ধারণায় রয়েছে নানা ঘাটতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ঘাটতি দূর করতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।

‎দেশের প্রায় এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত। বিশ্বে হেপাটাইটিসে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, এমন ১০টি দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনের পথে দেশ এখনো অনেকটাই পিছিয়ে। এই লক্ষ্য পূরণ শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল নয়; প্রয়োজন সামাজিক অংশগ্রহণ, সঠিক ধারণা ও সম্মিলিত সচেতনতা।

‎শিক্ষার্থীদের ধারণায় ঘাটতি

‎গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হেপাটাইটিস নামটির সঙ্গে অধিকাংশই পরিচিত। তবে নাম জানা থাকলেও রোগটি সম্পর্কে বিস্তারিত ও বৈজ্ঞানিক ধারণা অনেকেরই নেই।

‎ফার্মেসি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান রিফাত বলেন, ‘হেপাটাইটিস সম্পর্কে আগে থেকেই কিছুটা জানতাম। আমার ধারণা, এটি লিভারের একটি রোগ এবং রক্তের মাধ্যমে ছড়াতে পারে। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করলে এটি ছড়ায় কি না, সে বিষয়ে আগে আমার পরিষ্কার ধারণা ছিল না। রোগটির নাম আমরা অনেকবার শুনি, কিন্তু বিস্তারিত জানার সুযোগ খুব বেশি হয় না।’

‎হেপাটাইটিস সম্পর্কে পরিচিতির পাশাপাশি সংক্রমণের ধরন নিয়ে মানুষের মধ্যে থাকা দ্বিধার কথাও উল্লেখ করেন বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী পূর্ণতা সাহা দিয়া। তিনি বলেন, ‘আমি জানি, হেপাটাইটিস ‘বি’ একটি ভাইরাসজনিত রোগ। অনিরাপদ রক্ত গ্রহণ বা একই সূঁচ ব্যবহারের মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে বলে শুনেছি। তবে আগে আমার মনে হতো, আক্রান্ত ব্যক্তির খুব কাছাকাছি গেলেও হয়তো রোগটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরে জানতে পেরেছি, বিষয়টি নিয়ে মানুষের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে।’

‎টিকা নিয়েছেন কি না, জানেন না অনেকেই

‎হেপাটাইটিস ‘বি’-এর টিকা আছে এ কথা জানলেও নিজেদের টিকা নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত নন অনেক শিক্ষার্থী।

‎রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী উম্মে হাবিবা তিথি বলেন, ‘হেপাটাইটিসের টিকা আছে, এটি জানি। কিন্তু ছোটবেলায় টিকাটি নিয়েছি কি না, সেটি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি না। আমার মনে হয়, অনেক শিক্ষার্থীর অবস্থাও একই। রোগটি নিয়ে যতটা শুনেছি, টিকা ও পরীক্ষা সম্পর্কে ততটা বিস্তারিতভাবে জানতে পারিনি।’

‎লক্ষণ না থাকলেও থাকতে পারে সংক্রমণ

‎হেপাটাইটিস নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শ্যাম সুন্দর সাহা বলেন, ‘হেপাটাইটিসের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে দীর্ঘ সময় কোনো লক্ষণ প্রকাশ নাও পেতে পারে। ফলে তিনি নিজের অজান্তেই ভাইরাস বহন করতে পারেন এবং একপর্যায়ে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের মতো গুরুতর জটিলতায় আক্রান্ত হতে পারেন।’

‎তিনি বলেন, বিশেষ করে হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ শনাক্ত করার জন্য ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধে কার্যকর টিকা রয়েছে, কিন্তু হেপাটাইটিস ‘সি’-এর কোনো টিকা নেই। তবে বর্তমানে হেপাটাইটিস ‘সি’-এর কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে।‎সঠিক সময়ে পরীক্ষা, টিকা গ্রহণ, নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন এবং জীবাণুমুক্ত সূঁচ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

‎বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শুরু হোক সচেতনতা

‎দীর্ঘদিনের শিক্ষকতা ও জনস্বাস্থ্যবিষয়ক অভিজ্ঞতার আলোকে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অনুষদের ডিন ড. ফুয়াদ হোসেন বলেন, ‘হেপাটাইটিস প্রতিরোধকে শুধু চিকিৎসকের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে হবে না। এটি একটি সামাজিক ও জনস্বাস্থ্যগত বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের তরুণেরা সমাজের সচেতন অংশ। তাঁদের মধ্যে রোগটির সংক্রমণ, প্রতিরোধ, পরীক্ষা ও চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি করা গেলে সেই তথ্য পরিবার ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছাবে।’

‎তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত সচেতনতামূলক আলোচনা, হেপাটাইটিস ‘বি’-এর টিকা গ্রহণের অবস্থা যাচাই, প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং স্বেচ্ছামূলক স্ক্রিনিং কর্মসূচির আয়োজন করা যেতে পারে। নতুন শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশন কার্যক্রমেও হেপাটাইটিসসহ গুরুত্বপূর্ণ সংক্রামক রোগ সম্পর্কে তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

‎ড. ফুয়াদ হোসেন বলেন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রশাসন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে কাজ করলে ২০৩০ সালের মধ্যে হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে যেতে পারবে।

‎হেপাটাইটিস কী

‎হেপাটাইটিস লিভারের একটি প্রদাহজনিত রোগ, যা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এর মধ্যে ভাইরাসজনিত হেপাটাইটিস অন্যতম। এই রোগে লিভারের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে এটি সিরোসিস বা লিভার ক্যানসারের মতো গুরুতর জটিলতায় রূপ নিতে পারে।

‎হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধরনগুলোর মধ্যে ধরা হয়। অনেক ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে দীর্ঘদিন কোনো উপসর্গ প্রকাশ নাও পেতে পারে। ফলে তিনি অজান্তেই ভাইরাস বহন করতে পারেন।

‎হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রতিরোধে কার্যকর টিকা রয়েছে। হেপাটাইটিস ‘সি’-এর এখনো কোনো টিকা নেই, তবে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে এই রোগ নিরাময় সম্ভব।

‎বিশ্বব্যাপী হেপাটাইটিস নির্মূলের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজন সচেতনতা। আর সেই সচেতনতা তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ প্রজন্মই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি।

Link copied!