প্রকাশিত: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১১:১৩ এএম
ভেনেজুয়েলায় ২৪ জুন ভোর ৬টা ৪ মিনিটে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্প দুটির মাত্রা ছিল যথাক্রমে ৭.২ এবং ৭.৫। গত ১২৬ বছরের মধ্যে এত শক্তিশালী ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা না থাকায় দেশজুড়ে ব্যাপক আতঙ্ক ও ধ্বংসযজ্ঞের সৃষ্টি হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ দুর্যোগে অন্তত ২ হাজার ৬৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৬৬৬ জনেরও বেশি।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) জানিয়েছে, ভূমিকম্পে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৬.৭ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার) ছাড়িয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ৯০০ সেনাসদস্য মোতায়েন করেছে।
ভেনেজুয়েলার দুর্যোগ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৬২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ৮৬ হাজার ১১৭টি পরিবারকে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সরকারি হিসাব বলছে, ভূমিকম্পে মোট ৮৮৫টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৮৯টি সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
সরকার আরও জানিয়েছে, উদ্ধার অভিযানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী অংশ নিচ্ছেন। এছাড়া রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ৩০ হাজার সরকারি কর্মী দুর্গত এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর হাজারো বাস্তুচ্যুত মানুষ নিরাপদ পানির তীব্র সংকটে পড়েছেন। অনেকেই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন। মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতির কারণে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
অন্যদিকে নাসার স্যাটেলাইটভিত্তিক বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়েছে, ভূমিকম্পে প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত অথবা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে থাকতে পারে। এই সংখ্যা সরকারের প্রকাশিত সর্বশেষ সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি।
মানবিক সংস্থাগুলোর ভাষ্য, ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি দ্রুত একটি বড় স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে। যথাসময়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে আগামী দিন ও সপ্তাহগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট, স্বাস্থ্য খাতে সীমিত বিনিয়োগ এবং চিকিৎসকদের দেশত্যাগের কারণে ভেনেজুয়েলার স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাও এ দুর্যোগে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
কারাকাসের হাসপাতাল দেল ওয়েস্তে ড. হোসে গ্রেগরিও হার্নান্দেজ হাসপাতালের ট্রমা ইউনিটের প্রধান ইউজেনিও কোভা বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ সংক্রমণ। দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা আহতদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য জাতিসংঘের মানবিক সংস্থার মুখপাত্র ভেরোনিক দুরো জানান, প্রচণ্ড গরমের কারণে মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী মানবিক সহায়তাবাহী বিমান অবতরণের সুবিধার্থে কারাকাসের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়ে মেরামত করেছে। এছাড়া উপকূলীয় এলাকায় নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে এবং মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আরও ১০০ কর্মকর্তা এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন।
এ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘ ও বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার জন্য ৩০০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছে। তবে ইউএনডিপির স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬.৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি হওয়ায় ঘোষিত সহায়তা মোট প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত।
ইতোমধ্যে ইকুয়েডর, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ৫০টি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা কয়েকটি দেশের উদ্ধারকারীরাও মানবিক এই অভিযানে অংশ নিয়েছেন।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের ইউমারে শহরের দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে। অন্যদিকে ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল একই অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপের উত্তর-পূর্বে প্রায় ২৩.৯ কিলোমিটার দূরে।
দেশটির যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মূল ভূমিকম্পের পর এখন পর্যন্ত ৮৯০টি আফটারশক বা পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯০০ সালের সান নারসিসো ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হয়। ৭.৬ থেকে ৭.৭ মাত্রার সেই ভূমিকম্পে দেশটির উত্তর উপকূলজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল এবং রাজধানী কারাকাস ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
