মঙ্গলবার ২৫, আগস্ট ২০২৬

মঙ্গলবার ২৫, আগস্ট ২০২৬ -- : -- --

৪৭তম বিসিএসে অর্ধেকের বেশি পদ ফাঁকা, যোগ্যতার সংকটে প্রশ্ন উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে

ক্যাম্পাস প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:১১ পিএম

৪৭তম বিসিএসে অর্ধেকের বেশি পদ ফাঁকা, যোগ্যতার সংকটে প্রশ্ন উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে

৪৭তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল দেশের উচ্চশিক্ষার মান এবং চাকরিপ্রার্থীদের বাস্তব দক্ষতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। প্রায় পৌনে চার লাখ আবেদনকারীর মধ্য থেকে শেষ পর্যন্ত ক্যাডার পদে সুপারিশ পেয়েছেন মাত্র ১ হাজার ৩২০ জন। এতে মূল বিজ্ঞপ্তির অর্ধেকেরও বেশি পদ খালি রেখে ফল প্রকাশ করতে হয়েছে সরকারি কর্ম কমিশনকে (পিএসসি)। 

গত ২৮ জুন প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যায়, বিভিন্ন ক্যাডারে ১ হাজার ৩২০ জন এবং নন-ক্যাডারে ২০১ জনসহ মোট ১ হাজার ৫২১ জনকে সাময়িকভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ মূল বিজ্ঞপ্তিতে মোট ক্যাডার পদ ছিল ৩ হাজার ৪৮৭টি। অর্থাৎ ২ হাজার ১৬৭টি পদ পূরণ করা যায়নি।

পিএসসির তথ্যমতে, বিশেষ করে শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রকৌশলসহ টেকনিক্যাল ও বিশেষায়িত ক্যাডারে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থেকে গেছে। এসব ক্ষেত্রে প্রার্থীরা প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও চূড়ান্ত মূল্যায়নে ন্যূনতম পাস নম্বর অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এ পরিস্থিতি দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বিসিএসের মতো জায়গায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না, এটি আমাদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এ পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যাঁরা কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করছেন, তাঁদের বিষয়টি নতুন করে ভেবে দেখতে হবে। আমাদের কারিকুলামে কোনো ধরনের ফাঁক বা গ্যাপ থাকছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা দরকার। পাশাপাশি আমরা গ্র্যাজুয়েটদের প্রকৃত অর্থে মানসম্মত বা কোয়ালিটি এডুকেশন দিতে পারছি কি না, তা নিয়েও ভাবার সময় এসেছে।’

চাকরিপ্রার্থীদের একটি অংশ মনে করছেন, টেকনিক্যাল বিষয়ের প্রশ্নপদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এবং প্রস্তুতির স্বল্প সময় এই ফলাফলের বড় কারণ। তাঁদের ভাষ্য, আগের বিসিএসগুলোতে যেখানে টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলনামূলক মৌলিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা আরও বিশ্লেষণধর্মী ও গভীর হয়েছে। ফলে সাধারণ ও বিশেষায়িত দুই ধরনের প্রস্তুতি একসঙ্গে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিশেষ করে আগামী ৫০তম বিসিএসে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার মধ্যবর্তী সময় মাত্র ৫৮ দিন নির্ধারণ করায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। অনেকের মতে, এত কম সময়ে বিশাল সিলেবাস কভার করে উভয় ক্যাটাগরিতে দক্ষতা অর্জন প্রায় অসম্ভব।

এ বিষয়ে পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেম বলেন, বর্তমান পরীক্ষায় মুখস্থনির্ভরতার পরিবর্তে বিশ্লেষণ, যুক্তি ও সমস্যা সমাধানভিত্তিক প্রশ্নের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির সঙ্গে অনেক প্রার্থী এখনো পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘বিসিএস হচ্ছে দেশের মেধা যাচাইয়ের সর্বোচ্চ স্তর। কারিগরি ও বিশেষায়িত ক্যাডারে যে ধরনের যোগ্যতার প্রয়োজন, প্রার্থীরা পরীক্ষায় সেই ন্যূনতম মানদণ্ড বা নির্ধারিত পাস নম্বর তুলতে পারেননি। পদ খালি গেছে বলে আমরা পাস নম্বর কমিয়ে কম যোগ্য কাউকে ক্যাডার পদে সুপারিশ করতে পারি না। পিএসসি সরকারি কর্মক্ষেত্রের গুণগত মান ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। মেধার মূল্যায়নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না।’

পিএসসি চেয়ারম্যান আরও জানান, নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রশাসনিক ও কারিগরি কাজ শেষ করে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে।

তবে ফলাফল প্রকাশের পর যে বাস্তবতা সামনে এসেছে, তা শুধু বিসিএসের প্রতিযোগিতামূলক মানদণ্ড নয়—দেশের উচ্চশিক্ষা, কারিকুলাম কাঠামো এবং কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নের প্রশ্নকেও নতুন করে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

Link copied!