প্রকাশিত: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১২:৩৭ এএম
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) পাঁচটি আবাসিক হলের ডাইনিং ব্যবস্থার প্রতি ক্রমেই অনাগ্রহ বাড়ছে শিক্ষার্থীদের। হলের খাবারের নিম্নমান, মুখরোচক না হওয়া, একঘেয়ে মেনু এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে অধিকাংশ আবাসিক শিক্ষার্থীই ডাইনিং এড়িয়ে চলছেন। ফলে বিকল্প হিসেবে বাহিরের হোটেলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন একইরকম খাবার, কখনও নির্দিষ্ট সময়ের পরে গেলে খাবার না পাওয়া আবার নির্দিষ্ট সময়ের আগে গেলেও খাবারের কমতি পড়ার মতো বহু সমস্যার কারণে বাহিরের খাবারের প্রতি বেশি নির্ভরশীল হতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। শিক্ষার্থীদের ধারণা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর ডাইনিং ব্যবস্থা একসময় পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়বে।
কাজী নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রুবায়েত হোসাইন বলেন, 'হলে দুপুরে মাছ, মাংস কিংবা ডিম দেওয়া হলেও খাবারে তেমন কোনো স্বাদ থাকে না। বিশেষ করে রাতের খাবার নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট পোহাতে হয়। বাধ্য হয়ে প্রায়ই বাহিরের হোটেল থেকে খাওয়া-দাওয়া করতে হচ্ছে। এই সমস্যার সমাধানে হল কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময় কিছু পদক্ষেপ নিলেও দিনশেষে ঘুরেফিরে একই অবস্থা দাঁড়াচ্ছে।'
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাইনিংয়ের বাবুর্চিরা জানায়, হলের মেনুতে সাধারণত এক বেলা মাছ ও এক বেলা মাংসের ব্যবস্থা থাকে। এ ছাড়া সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন শাক-সবজি অথবা ভাজি-ভর্তা দেওয়া হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে অনেক সময় সপ্তাহে সাতদিনই ব্রয়লার আর মাছ দেওয়া হয়। যা স্বাদের দিক দিয়েও থাকে নিম্নমানের। ফলে বাহিরের হোটেলের দিকে ঝুঁকছে শিক্ষার্থীরা।
এনিয়ে বিজয়-২৪ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, 'ডাইনিংয়ে নিয়মিত একই খাবার (ব্রয়লার মুরগি) দেওয়া হয় এবং মাংসের টুকরোর আকার খুবই ছোট। যে টাকা দিয়ে এই খাবার খেতে হয়, সেই একই খরচে বাহিরে বিভিন্ন তরকারি দিয়ে অনেক ভালোভাবে খাওয়া যায়।'
বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণেই একই মেনু বারবার দিতে হচ্ছে বলে জানায় হলের মিল ম্যানেজাররা।
তারা জানায়, বাড়তি খরচের বাজারে একটির বেশি তরকারি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। মাছের দাম তুলনামূলক বেশি হওয়ায় বাধ্য হয়ে ব্রয়লার মুরগি দিতে হচ্ছে। ব্রয়লার ছাড়া অন্য কিছু দিতে গেলে খরচ অনেক বেশি পড়ে যায়, যা বর্তমান মিল রেটে সমন্বয় করা সম্ভব নয়।
ফলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হলের মিল ম্যানেজাররাও প্রশাসন থেকে ভর্তুকির মাধ্যমে সংকট সমাধানের কথা জানান।
এদিকে নারী শিক্ষার্থীদের দুটি হল নিয়ে অভিযোগ আরো বিস্তর। সেখানে শিক্ষার্থীরা জানায়, খাবারের মান এতই অস্বাস্থ্যকর যে, শিক্ষার্থীরা ফুড পয়জনিংয়ের শিকারও হয়েছেন। ফলে, মেয়েদের হলে হলের ডাইনিংয়ে খাওয়ার সংখ্যাটাও অতি অল্প এবং বেশিরভাগই বাহিরের হোটেলের উপর নির্ভরশীল, জানান শিক্ষার্থীরা।
নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী তাসমিয়া ফারিন অভিযোগ করে বলেন, 'মিলের টাকা অনুযায়ী খাবারের মান আরও ভালো হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ডাইনিংয়ে এমন খাবার দেওয়া হয়, যা খেয়ে প্রায়ই শিক্ষার্থীরা ফুড পয়জনিংয়ে আক্রান্ত হন। একই টাকা দিয়ে বাহিরে খেলে তৃপ্তি পাওয়া যায়, স্বাদও থাকে। হলের চেয়ে বাহিরের খাবার অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর।'
পড়াশোনার পাশাপাশি বেশিরভাগ শিক্ষার্থী টিউশনির উপর নির্ভর হওয়ায় রাতে হলে অনেক শিক্ষার্থী নয়টার মধ্যে হলে ফিরতে পারে না। কিন্তু হলের টোকেন সংগ্রহের সময় নয়টা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ফলে চাইলেও অনেকে টোকেন সংগ্রহ করতে না পেরে বাহিরের হোটেলে ঝুঁকছে।
সুনীতি শান্তি হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান মিমি বলেন, 'রাতের খাবারের টোকেন রাত ৯টার মধ্যেই সংগ্রহ করতে হয়। এই নির্ধারিত সময়ের পর আর টোকেন পাওয়া যায় না৷ ফলে অনেক শিক্ষার্থীকে বাহিরে খেয়ে থাকতে হয়।'
তিনি আরো বলেন ,'খাবারের মান ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করলে, টোকেন সংগ্রহের সময়সীমা বৃদ্ধি করা হলে এবং শিক্ষার্থীদের দেওয়া অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মানসম্পন্ন খাবার পরিবেশন করা হলে শিক্ষার্থীরা হলে খাওয়ার আগ্রহ ফিরে পেতে পারে।'
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রভোস্ট কমিটির আহ্বায়ক এবং কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রাধ্যক্ষ মো. হারুন বলেন, 'শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমার পেছনে প্রধান কারণ ছিল একঘেয়ে মেনু। আমরা পরীক্ষামূলকভাবে কাজী নজরুল ইসলাম হলের মেনুতে পরিবর্তন এনেছিলাম। কিন্তু এরপরও শিক্ষার্থীরা হলের খাবার গ্রহণ না করে বাইরের খাবারের ওপরই নির্ভর করছে।'
ভর্তুকির সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, 'বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে ডাইনিংয়ের জন্য কোনো ভর্তুকি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। তা সত্ত্বেও আমরা প্রশাসনের কাছে বিষয়টি বারবার তুলে ধরার চেষ্টা করছি।' বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্যের কাছেও ডাইনিংয়ে ভর্তুকির বিষয়টি জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হবে বলে জানান তিনি।
ভর্তুকির সংকট সমাধানের বিষয়ে তিনি যোগ বলেন, দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের নিজস্ব আয়ের উৎস (যেমন: মার্কেট পরিচালনা বা দোকান ভাড়া) থাকে, যা দিয়ে ডাইনিংয়ে ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো এমন কোনো বাণিজ্যিক বা নিজস্ব আয়ের উৎস গড়ে ওঠেনি।
শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলের প্রাধ্যক্ষ ড. মো: জনি আলম বলেন, 'হল অব্যবস্থাপনা ও খাবারের মান ঠিক করার জন্য আমরা প্রতি মাসে মতবিনিময় সভা করি। শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করার মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য একাধিক বাবুর্চি নিয়োগসহ খাবারের মেনু পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।'
তিনি আরো বলেন ,'আমি নিয়মিত আমার হলে মনিটরিং করে। মাঝেমধ্যে আমি কাউকে না জানিয়ে হলে খাবার খাই এবং যে সব জায়গায় সমস্যা দেখি তা সমাধানের জন্য নির্দেশনা দিই।'
মেয়েদের হলে কম মিল হওয়ার পিছনে নিজে রান্না করে খাওয়ার প্রবণতাকে উল্লেখ করে নওয়াব ফয়জুন্নেসা চৌধুরাণী হলের প্রাধ্যক্ষ ড. সুমাইয়া আফরীন সানি বলেন, 'শিক্ষার্থীরা নিজেরা রান্না করে খেলে খরচ কম পড়ে, তাই তারা ডাইনিং এ না খেয়ে নিজেরা রান্না করে খায়। এইজন্য মূলত ডাইনিংয়ে খাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম।'
অস্বাস্থ্যকর খাবারের মান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'শিক্ষাজীবনে অনেকেরই পণ্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকে না। তাই হইত তারা এটাকে নিম্নমানের মনে করছে। কিন্তু শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা সবসময় সর্বোচ্চটাই দেয়ার চেষ্টা করি, এইজন্য আমরা নিয়মিত মনিটরিংও করে থাকি।'
