প্রকাশিত: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম
জীবনের অভিযোগ-অনুযোগের কিনারায় দাঁড়িয়ে বিষন্নমনে সৃষ্টিকর্তাকে কয়েকটি প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হলো আপনার—করলেনও। শুধু আপনি নয়, এমন সর্বদা অনেকেই করে থাকি, তাই না? কিন্তু কখনও ভেবেছেন, হৃদয়ের কোণে জমা হওয়া সে প্রশ্নগুলো লিখে দিলেই আপনার জন্য খুলে যেতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির দুয়ার। এমনি প্রশ্ন এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে সেটি।
এখানেই শেষ নয়, এ বিশ্বায়নের অস্থিরতায় প্রায়শ আমরা ডুব দেই প্রিয় কোনো বইয়ের পাতায় কিংবা সিনেমার উজ্জ্বল আলোয়ে। বই পড়তে পড়তে আমাদের সঙ্গে দেখা মেলে চারপাশের নতমুখের চেনা নারীদের বাইরের অন্য এক নারীসত্ত্বার সঙ্গে। সিনেমায়ও তাই ঘটে। আমরা তখন সেই চরিত্রের সঙ্গে বাঁচতে শুরু করি, পথচলি, হাসি-কাঁদি এমনকি পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে শিখি। ওই শক্তিশালী নারী-চরিত্রের প্রেমেও পড়ি, তাই না? যদি হয়, লিখে ফেলুন ‘সাহিত্যে-পড়া বা সিনেমায় দেখা সবচেয়ে শক্তিশালী নারী-চরিত্র’ নিয়ে আপনার যাপন, আপনার ভাবনা। আর সেটিই খুলে দেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানের দুয়ার।
এমনও হতে পারে সেই পথের পাঁচালীর দুর্গা, যার কখনও ট্রেনে চড়া হয়নি, কিন্তু এবার আপনার সঙ্গে ট্রেন ভ্রমণে থাকছে দুর্গা। এমন সুযোগ পেয়ে আপনার মনের দুয়ারে কড়া নাড়তে পারে স্বয়ং বিভূতিভূষণ চট্টোপাধ্যায়। নিশ্চয় আপনার কত কি বলার আছে! বাধা কোথায়? ২ ঘণ্টা ধরে লিখে ফেলুন মনের সব কথা, আর বাংলা সাহিত্যের বিশালতায় হারানোর অনন্য সুযোগ লুফে নিন। শুধু তাই নয়, ২ ঘণ্টা সময় নিয়ে মন খুলে লেখার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তিচ্ছুদের জন্য সাজিয়েছে চমকপ্রদ প্রশ্নের ঝাঁপি।
জানা গেছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রশ্নপত্র এটি। স্নাতক স্তরে ভর্তির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে যে প্রবেশিকা পরীক্ষা নেওয়া হয় সেখানে পুঁথিগত জ্ঞান নয়, অন্তরের অনুভূতির কথা এভাবেই জানতে চাওয়া হয়েছে। প্রতিবছরই ছাত্রছাত্রীরা সিলেবাসের বাইরের কথা লিখতে পারবে এমন সম্ভাবনাময় প্রশ্নপত্র থাকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।
প্রশ্নপত্র সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর শুরু হয়েছে জোর আলোচনা। সিলেবাসভিত্তিক বা মুখস্থ নির্ভর প্রশ্নের বদলে সেখানে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অনুভূতি, পর্যবেক্ষণ এবং সৃজনশীল চিন্তাকে, এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেন এমন প্রশ্ন করা হয়? জানালেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের কয়েকজন অধ্যাপক৷ তাদের একজন রাজ্যেশ্বর সিনহা তিনি বলেন, কিছুই পড়ে আসতে হবে না কারণ আমি তোমাকে পড়াব৷ আমার শুধু দেখা প্রয়োজন তোমার নিজের ভাবার ক্ষমতা আর সেই ভাবনাকে তোমার প্রকাশ করার ক্ষমতা৷ আমি নিজে একজন চাষী পরিবারের ছেলে৷ আমার বাড়িতে গীতাঞ্জলিও ছিল না, কিছুই ছিল না৷ আমি কোথা থেকে পাব বই? তাই জ্ঞান নয়, একজন মানুষের মধ্যে অর্জন করার ধারণ করার ক্ষমতা কতখানি সেটাই দেখা হয়৷ সৃজনশীল চিন্তা এবং সেটাকে প্রকাশ করার ভাষিক দক্ষতা, এখানেই জোর বেশি। কয়েকটা জিনিস কম বা বেশি জানা, সেটা গৌণ। সমস্ত পরিবেশ পরিস্থিতির মানুষ যাতে ধারণ করতে পারে সেই কথা মাথায় রেখেই এই প্রশ্নপত্র।
অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিনহা আরও বলেন, আমাদের সবসময় চেষ্টা থাকে গ্রাম থেকে শহর,উত্তর থেকে দক্ষিণ সব স্কুলের বারো ক্লাস পাস করা ছেলেমেয়েদের জগতটাকে যাতে ছোঁয়া যায়। আমরা এটা বুঝি যে শুধু কলকাতা বা শহরে থাকা ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে না৷ গ্রাম, মফস্বল পাহাড় থেকে সাগর সব জায়গার ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে যাদবপুরে৷ নানারকম পরিবেশ নানারকম পরিস্থিতিতে তাদের বেড়ে ওঠা, তাদের সংবেদনশীলতা, চিন্তা, বিবেচনাবোধ সব ভিন্ন৷ যে ধরনের পারিবারিক পরিবেশ থেকেই আসুক না কেন, প্রত্যেক মানুষের নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ আছে৷ আমাদের মূল উদ্দেশ্য থাকে সকলে যেন নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে৷ শিলিগুড়ি থেকে সুন্দরবন সব জায়গার মানুষ যাতে উত্তর লিখতে পারে সেই চেষ্টা করা হয়৷ বিশাল বুদ্ধি বা জ্ঞান দরকার আছে তেমন নয়, ভাবার ক্ষমতা আর ভাষার মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশের ক্ষমতাটাই দেখা হয়।
আরেক অধ্যাপক জয়দীপ ঘোষ। তিনি বলেন, এই ধরনের প্রশ্নের যেটা মজা, বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন পরিবেশের মানুষের অভিজ্ঞতা আলাদা, তাই তাদের উত্তর বিভিন্ন হবে। যিনি অনেক পড়াশোনা করেছেন তিনি একরকম লিখবেন আবার যিনি কিশোর কিশোরী তাঁর উত্তর লেখা তার প্রকাশ অন্যরকম হবে৷ এই প্রশ্নের মধ্যে বহুবিচ্ছুরণের মাত্রা আছে৷ আমরা কখনওই ভাবি না সদ্য স্কুল পাশ করা ছেলেমেয়ে বিশাল বৌদ্ধিক কিছু লিখবেন৷ আমাদের যে ভর্তির পরীক্ষা হয়, সেখানে ৫০% উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর আর ৫০% অ্যাডমিশন টেস্টে পাওয়া নম্বর মিলিয়ে হয়৷ কেমন লেখাপড়া, সিলেবাস কতটা পড়েছে সেটা উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর দেখেই বুঝতে পারছি৷ সিলেবাসের পড়ার বাইরে সে কতটা ভাবতে পারে, মানুষ সমাজ প্রকৃতি সংস্কৃতি তার বয়স অনুযায়ী সে কতটা সংযুক্ত সেটাই আমরা দেখার চেষ্টা করি৷ যেখানে তার ভাবনাকে আমরা জানতে পারি। এই ভাবনাকে সে তার বয়স অনুযায়ী কতটা ভালো ও সহজভাবে প্রকাশ করতে পারছে সেটা বুঝতে পারি।
অধ্যাপক জয়দীপ ঘোষ বলেন, জীবনানন্দের কবিতায় অবসাদ এই ধরনের প্রশ্ন দেওয়া হয় না৷ কারণ সকলের প্রচুর বই পড়ার মতো সুযোগ থাকে না সবসময়। প্রশ্নে এত অপশনও সেই কারণেই দেওয়া হয়৷ সকলেই যেন নিজের কথা কিছু অন্তত লিখতে পারে। এই যেমন গাছ কাটা হচ্ছে, পাখিদের কথোপকথন, এর জন্য প্রচুর বই পড়তে হবে না। হৃদয়ে সামান্য বেদনাবোধ আর প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সামান্য বোঝাপড়া থাকলেই এই উত্তর লিখতে পারবে। প্রতিবছরই আমরা যখন খাতা দেখি, কিছু খাতা এমন থাকে যা দেখে আমরা চমকে যাই। খাতা দেখা হয় চা মুড়ি খেতে খেতে আড্ডার মেজাজে৷ কেউ ভাল উত্তর লিখলে মনে হয় এ যেন আমাদেরই অর্জন।
অধ্যাপক ছন্দম চক্রবর্তী বলেন, আমরা দেখার চেষ্টা করি একজন ছাত্রের চিন্তা করার শক্তি৷ চারপাশের সমাজকে সে কীভাবে দেখে এবং সেই দেখাটা বাংলা ভাষার মাধ্যমে সে কীভাবে প্রকাশ করতে পারে। নিছক তথ্য নয়, ছাত্রের মন বোঝার চেষ্টা করা হয়৷ যেহেতু তথ্যের বাইরের লেখা তাই ছাত্রের ভাষিক দক্ষতাটাও বোঝা যায়৷ পড়াশোনার জন্য আগামী চার বছর রইল। কিন্তু জীবনকে সে কীভাবে দেখে সেটুকু জানতে চাই আমরা।
